‘গলায় দ’ড়ি পেঁ’চিয়ে ঝু’লিয়ে দেওয়ার হু’মকি!’ ‘আমায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাস্তায় টানতে টানতে…’ জলজ্যান্ত শয়তানের আরেক রূপ দেবরাজ চক্রবর্তী! চায়ের দোকান থেকে কোটি টাকার প্রমোটিং! রাজারহাটের মানুষদের পায়ের তলায় পি’ষে দিয়েছিলেন অদিতি মুন্সির স্বামী!

রাজারহাট-গোপালপুর বিধানসভা এলাকায় দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চলা রাজনৈতিক অরাজকতা এবং দুর্নীতির এক ভয়ানক চিত্র এবার প্রকাশ্যে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকার দাপুটে তৃণমূল নেতা দেবরাজ চক্রবর্তীর (Debraj Chakraborty) বিরুদ্ধে স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। আজ তক বাংলার একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ থেকে শুরু করে ভোট-পরবর্তী হিংসার যে খতিয়ান ভুক্তভোগীরা তুলে ধরেছেন, তা শুনে শিউরে উঠছেন অনেকেই। রাজারহাটের এই পরিস্থিতি নিয়ে এখন রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
এলাকার সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, রাজারহাট-গোপালপুর এলাকায় দেবরাজ চক্রবর্তীর অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করা অসম্ভব ছিল। এক স্থানীয় নারী বিজেপি নেত্রীর দাবি অনুযায়ী, সেখানে সাধারণ মানুষ নিজের জমিতে একটা বাড়ির পাঁচিল তুলবেন, তার জন্যও দেবরাজের অনুমতি নিতে হতো। শুধু তাই নয়, বাড়ি তৈরির সমস্ত সিমেন্ট এবং নির্মাণ সামগ্রী কিনতে হতো দেবরাজের নিজস্ব সিন্ডিকেটের লোকদের কাছ থেকে। সামান্য চায়ের দোকান, ফলের দোকান থেকে শুরু করে রুটের বাস দাঁড় করানোর জন্য পর্যন্ত প্রতি মাসে মোটা টাকা তোলা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ। একজন সাধারণ কাউন্সিলর পদের মানুষ কীভাবে প্রায় ১৩০০ কোটি টাকার মালিক হলেন এবং পাহাড় থেকে শুরু করে সমতলে বিপুল ল্যান্ড ও পুকুর ভরাট করে সম্পত্তি বানালেন, তা নিয়ে এখন বড়সড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় এবং গুরুতর অভিযোগ হলো রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও খুনের রাজনীতি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর রাজারহাটে যে ব্যাপক তাণ্ডব চলেছিল, তার যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন এক বিজেপি কর্মী। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলের হয়ে বুথে বসার অপরাধে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা তাঁর গলায় দড়ি পেঁচিয়ে ইলেকট্রিক তারের সাথে ঝুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। প্রাণভয়ে দীর্ঘদিন তাঁরা বাড়ি ছাড়া ছিলেন। এমনকি এলাকার হরিচাঁদ পল্লীর প্রসেনজিৎ নামের এক ২৬ বছরের যুবক, যিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁকে আটকে রেখে নির্মম অত্যাচার করার পর ১২ ফুট ওপর থেকে নিচে ফেলে খুন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সমস্ত ঘটনার বিষয়ে ভয়ে কেউ পুলিশের কাছেও যাওয়ার সাহস পেতেন না, কারণ তাঁদের মতে পুলিশও ছিল সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়।
এই পুরো ক্ষমতার বৃত্তে দেবরাজ চক্রবর্তীর পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী তথা স্থানীয় বিধায়ক ও জনপ্রিয় কীর্তন শিল্পী অদিতি মুন্সির ভূমিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ভিডিওর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অদিতি মুন্সি মানুষের সামনে একজন সহজ-সরল ঈশ্বরভক্ত ও শিল্পীর মুখোশ পরে থাকতেন, অথচ নেপথ্যে চলত তাঁর স্বামীর চরম দাপট। অভিযোগ উঠেছে যে, বিগত নির্বাচনগুলোতে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে হাতিয়ার করে ভোট ব্যাঙ্ক গোছাতেন অদিতি। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ‘গোপাল ঠাকুরের’ মূর্তির ওপর হাত রাখিয়ে সাধারণ মানুষকে শপথ করাতেন যাতে তাঁরা তৃণমূল কংগ্রেসকেই ভোট দেন। সাধারণ মানুষ হিন্দু ধর্মের প্রতি অনুভূতির কারণে বাধ্য হয়ে সেই ফাঁদে পা দিতেন, আর অন্যদিকে তাঁর স্বামী পর্দার আড়ালে ত্রাসের রাজত্ব চালাতেন।
আরও পড়ুনঃ মেয়ের সুখের খোঁজ নিল কমলা-শ্রীনিবাস! অষ্টমঙ্গলায় সম্রাটকে নিয়ে বাবা-মাকে কি বললো ঝিনুক? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ওঠা এই সমস্ত অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক আইনি পদক্ষেপের পর রাজারহাট-গোপালপুরের সাধারণ মানুষ ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে এক স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগীদের একটাই দাবি, দীর্ঘদিন ধরে যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে এবং রাজারহাটকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছে, তাদের প্রত্যেকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা কেবল রাজারহাটের নয়, বরং রাজ্যের শাসকদলের একাংশের ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রশাসন এই সমস্ত অভিযোগের ভিত্তিতে দোষীদের কতটা কঠোর শাস্তির মুখে দাঁড় করাতে পারে।

