‘আমাদের তো কোন সন্তান নেই…’ ১৯ বছর বয়সে বিয়ে! স্বামীর অসুস্থতায় নিয়েছিলেন বিরতি! শুটিং ফ্লোরে দিন কাটলেও মন পড়ে থাকত বাড়িতে! স্বামীর জন্য স্ত্রীর আত্মত্যাগ! সাফল্য থেকে আক্ষেপ, সব নিয়ে অকপটে লিলি চক্রবর্তী?

বাংলা বিনোদন জগতের অন্যতম কিংবদন্তি ও জ্যেষ্ঠ অভিনেত্রী হলেন লিলি চক্রবর্তী (Lily Chakraborty)। দশকের পর দশক ধরে ‘দেয়া নেয়া’, ‘জন অরণ্য’, ‘ছদ্মবেশী’ থেকে শুরু করে হালফিলের নানা জনপ্রিয় মেগা ধারাবাহিকে নিজের সাবলীল অভিনয়ে দর্শকের মন জয় করে এসেছেন তিনি। রূপোলি পর্দার এই উজ্জ্বল উপস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে এক সাধারণ ও অত্যন্ত আবেগময় জীবনের গল্প, যেখানে তিনি কেবল একজন সফল অভিনেত্রী নন, বরং একজন দায়িত্বশীল ও অনুরাগী স্ত্রীর ভূমিকাও পালন করেছেন সমান নিষ্ঠায়।
লিলি চক্রবর্তীর ব্যক্তিগত জীবনের অধ্যায়টিও বেশ আকর্ষণীয়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ব্যবসায়ী অজিত কুমার ঘোষের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন অভিনেত্রী। মজার বিষয় হলো, অজিতবাবু প্রথম দিকে ফিল্ম স্টুডিওতে এসেছিলেন সিনেমা প্রযোজনা করার ইচ্ছা নিয়ে, কিন্তু সিনেমা বানানো না হলেও লিলি চক্রবর্তীকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে বেছে নেন। সংসার শুরু করার পর থেকে অজিতবাবু সর্বদা স্ত্রীকে অভিনয় চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জুগিয়ে গিয়েছেন এবং তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন ছিল পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় ভরপুর।
জি বাংলার জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘অপুর সংসার’-এ অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে অভিনেত্রী তাঁর জীবনের এক কঠিন ও আবেগঘন অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি জানান, একটি সময়ে অভিনয় জগতে টানা কাজ করার মাঝেই হঠাৎ তাঁকে বেশ কিছুদিনের জন্য বিরতি নিতে হয়েছিল। এর নেপথ্যে ছিল তাঁর স্বামীর গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা। চোখের অপারেশনের পর অজিতবাবুর দৃষ্টিশক্তিতে বেশ কিছু জটিলতা দেখা দেয়, যার ফলে তিনি স্পষ্ট দেখতে পারতেন না এবং বাড়িতে একা থাকার কারণে যে কোনো মুহূর্তেই বড় কোনো বিপদের ঝুঁকি থাকত।
শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও অভিনেত্রীর মন পড়ে থাকত বাড়িতে একা থাকা অসুস্থ স্বামীর কাছে। তাঁর স্বামীও একা থাকতে ভয় পেতেন এবং লিলি চক্রবর্তীকে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসার জন্য অনুরোধ করতেন, তবে তিনি কখনোই চাননি যে তাঁর স্ত্রী অভিনয় জীবন একেবারে ছেড়ে দিন। লিলি চক্রবর্তী অনেক সময় পরিচালকদের কাছে অনুরোধ করে শুটিং জলদি শেষ করে বাড়ি ফিরে আসতেন। কিন্তু এভাবে কোনো স্থায়ী সমাধান মিলছিল না। একদিন বাড়িতে পড়ে গিয়ে মারাত্মক চোট পান তাঁর স্বামী। এই ঘটনার পর অভিনেত্রী বুঝতে পারেন পরিস্থিতি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে এবং তিনি অভিনয় থেকে নিজেকে পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়ার চরম সিদ্ধান্ত নেন।
আরও পড়ুনঃ ‘সোনা বন্ধু রে’ থেকে ‘ময়না ছলাৎ ছলাৎ’, তাঁর কণ্ঠের জাদুতেই কেটেছে হাজারো বাঙালির ছোটবেলা! প্রয়াত সেই জনপ্রিয় শিল্পী স্বাগত দে! অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন বাংলার লোকসঙ্গীত জগৎ!
স্বামীর দেখাশোনার স্বার্থে অভিনয় জগত থেকে দীর্ঘ কয়েক বছরের এই বিরতি তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরবর্তীতে ২০১০ সালে লিলি চক্রবর্তীর স্বামী প্রয়াত হন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আবারো চেনা আলোয় ফিরে আসেন এবং নতুন উদ্দীপনায় অভিনয় শুরু করেন। বর্তমানে একা থাকলেও কাজের মাঝেই নিজের জীবনের আনন্দ খুঁজে নেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। অভিনয়জীবনের খ্যাতির পাশাপাশি স্বামীর প্রতি তাঁর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ বিনোদন জগতের ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

