‘আগে ভোটার সরকার বাছত, এখন সরকার ভোটার বাছছে!’ ‘এক স্বৈরাচারী মহিলা থেকে সদ্যমুক্ত হয়েছি!’ নাম না করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কে কটাক্ষ! দুই দলকে একই আসনে বসালেন চন্দন সেন?

বাংলা থিয়েটার এবং অভিনয় জগতের অন্যতম এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নক্ষত্র শ্রী চন্দন সেন (Chandan Sen)। বহু দশক ধরে মঞ্চ, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের পর্দায় নিজের ক্ষুরধার অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি। কেবলমাত্র একজন শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবেই নয়, বরং থিয়েটারকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা এবং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বর হিসেবেও তিনি সংস্কৃতি মহলে সমান সমাদৃত। উৎপল দত্ত ও রমাপ্রসাদ বণিকের মতো প্রবাদপ্রতিম নির্দেশকদের ঘরানায় তৈরি হওয়া এই নাট্য ব্যক্তিত্ব বরাবরই স্পষ্টভাষী। সম্প্রতি ‘বর্তমান ডিজিটাল’-কে দেওয়া একটি এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর শৈশব, থিয়েটারের আদর্শ, সমকালীন রাজনীতি এবং সমাজব্যবস্থার অবক্ষয় নিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই অভিনেতা তাঁর অতিবাহিত শৈশবের সঙ্গে বর্তমান সময়ের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক তুলনা টেনে আনেন। তাঁর মতে, ছোটবেলার সেই চন্দন সেন আর এখনকার চন্দন সেনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত তখন পৃথিবীটা অনেক সহজ-সরল ছিল, আর এখনকার দুনিয়া ভীষণ জটিল ও হিসেবি হয়ে উঠেছে। আগে যেখানে বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে অনায়াসে চলে যাওয়া যেত, আজ সেখানে যাওয়ার আগে হাজারটা সামাজিক ও আনুষ্ঠানিকতার হিসেব কষতে হয়। এই পরিবর্তিত ও যান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। বিশেষ করে ভারতের বিপুল সংখ্যক শিশুর শিক্ষা ও পুষ্টির অভাব, শিশু আত্মহত্যার ঊর্ধ্বমুখী হার এবং সাধারণ মানুষের চরম অর্থনৈতিক বিপন্নতা তাঁকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করে চলেছে।

পরিবেশের ক্রমাগত অবক্ষয় এবং জলবায়ু সংকট নিয়ে অত্যন্ত ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এই আজীবন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষটি। হাসদেও কিংবা আন্দামানের মতো অঞ্চলের বিস্তীর্ণ রেইনফরেস্ট ও বনাঞ্চল ধ্বংসের পেছনে এক শ্রেণীর মানুষের সীমাহীন লোভ এবং সরকারি সদিচ্ছার চরম অভাবকে দায়ী করেছেন তিনি। পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বড় বড় প্লাকার্ডে ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ স্লোগান দেওয়ার আড়ালে কীভাবে দেশের একের পর এক জঙ্গল কেটে সাফ করে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে তিনি তীব্র ব্যঙ্গ করেন। প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং তথাকটিকে উন্নয়নের নামে ইকো-রিসোর্ট বানিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার বিরুদ্ধে সরব হয়ে তিনি পাটজাত বা পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের ওপর জোর দেন, যা কেবল প্রশাসনের কঠোর স্বশাসনের মাধ্যমেই সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে চন্দন সেন জানান যে, তিনি নির্দিষ্ট কোনো দলীয় রাজনীতির অনুসারী নন এবং ১৯৯৫ সাল থেকেই তিনি বামেদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তৎকালীন নাগরিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে কর্মজীবনে তাঁকে নানাবিধ কোণঠাসা পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছিল, এমনকি একসময় সরকারি হল পাওয়া থেকেও বঞ্চিত হতে হয়েছিল। রাজনৈতিক দলবদলের হিড়িককে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ক্ষমতার অলিন্দে টিকে থাকার জন্য পুরোনো আমলের বহু সুবিধাবাদী নেতা রাতারাতি বাম থেকে তৃণমূল এবং পরবর্তীতে বিজেপিতে রূপান্তর হয়েছেন। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান যে, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় আইনের চোখে চরম বৈষম্য তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণ অপরাধীদের অমানবিক মধ্যযুগীয় বর্বরতায় শাস্তি দেওয়া হলেও, প্রভাবশালী অপরাধী, নেতা বা পুলিশ আধিকারিকদের অত্যন্ত সুকৌশলে আড়াল করা হয়।

আরও পড়ুনঃ বাবার হাত অকেজো! স্কুলের ফিজ দিতে না পেরে সইতে হয়েছে অপমান! পড়াশোনার জন্য বিক্রি করেছিলেন অন্নপ্রাশনের গয়না! অভাব অনটনে কেটেছে ছোটবেলা! বাবাকে নিয়ে আবেগপ্রবণ মানালি দে!

থিয়েটারের মঞ্চ থেকে আকস্মিকভাবে টেলিভিশনের ডেইলি সোপ বা মেগা সিরিয়ালে পদার্পণ করার পেছনে নিজের পেশাদারিত্ব এবং আর্থিক বাধ্যবাধকতার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন অভিনেতা। তিনি মনে করেন, একজন শিল্পীকে টিকে থাকতে হলে এবং নিজের চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পেশাদার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কোনো রূপ অলীক মোহে না ভেসে জীবনধারণের জন্য আর্থিক সংস্থিতির প্রয়োজনীয়তাকে মেনে নিয়েই তিনি সিরিয়ালের দুনিয়ায় পা রাখেন। তবে রূপালি পর্দার চাকচিক্যের মাঝেও নিজের নাট্যভাবনা ও আদর্শ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। আজও তিনি তৎকালীন সমাজ ও সময়ের দাবিকে ধারণ করে মেঘনাদ সাহার জীবনীর মতো দায়বদ্ধ নাটক মঞ্চস্থ করে চলেছেন এবং আজীবন ক্ষমতার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে আমজনতার পক্ষে কথা বলার সেই উৎপল দত্তীয় দর্শনকেই বুকে ধারণ করে চলেছেন।

Back to top button