বিচ্ছেদের চার বছর পর আসানসোলের হোটেলে ভয়ংকর পরিণতি! কেন আ’ত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন অভিনেত্রী অপর্ণা সেনের প্রথম স্বামী?

বাঙালি চলচ্চিত্র জগতে (Tollywood) অপর্ণা সেন (Aparna Sen) কেবল একজন দক্ষ অভিনেত্রী বা পরিচালক নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। সত্যজিৎ রায়ের ‘মৃন্ময়ী’ থেকে আজকের সফল পরিচালক তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে সাফল্যের খতিয়ান আকাশছোঁয়া। তবে এই খ্যাতির আড়ালে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কথাই সাধারণ মানুষের অজানা রয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে তাঁর প্রথম জীবনের দাম্পত্য সঙ্গী সঞ্জয় সেনের কথা বর্তমান প্রজন্মের অনেকেরই অজানা। অপর্ণার পরবর্তী দুই স্বামী মুকুল শর্মা এবং কল্যাণ রায়ের নাম বারবার চর্চায় এলেও, সঞ্জয় সেনের নাম অনেকটা বিস্মৃতির আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। অথচ মজার বিষয় হলো, বিচ্ছেদের দীর্ঘ সময় পরেও অপর্ণা আজও তাঁর নামের পাশে প্রথম স্বামীর ‘সেন’ পদবীটি সগৌরবে বহন করে চলেছেন।
জন্মগতভাবে অপর্ণা সেন ছিলেন দাসগুপ্ত পরিবারের মেয়ে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক চিদানন্দ দাসগুপ্ত এবং সুপ্রিয়া দাসগুপ্তের কন্যা অপর্ণার খুব অল্প বয়সেই অভিনয় জগতে হাতেখড়ি হয়েছিল। অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। শোনা যায়, মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি সঞ্জয় সেনের প্রেমে পড়েছিলেন। সেই সময়ের নিরিখে তাঁদের ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত চর্চিত একটি বিষয়। দীর্ঘ প্রেমের পর ১৯৬৬ সালে যখন অপর্ণার বয়স মাত্র ২১ বছর, তখন তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সঞ্জয় সেন নিজেও ছিলেন একজন অত্যন্ত সৃজনশীল মানুষ। শর্ট ফিল্ম, ডকুমেন্টারি এবং বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় নির্মাতা হিসেবে সেই সময় তাঁর যথেষ্ট পরিচিতি ও খ্যাতি ছিল।
বিবাহিত জীবনের শুরুর দিকে এই দম্পতির ঘরে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, যাঁর নাম কমলিনী। ডাকনাম ডোনা হলেও বর্তমানে তিনি কমলিনী চ্যাটার্জি নামেই পরিচিত এবং দীর্ঘকাল ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সঞ্জয় ও অপর্ণার ঘর আলো করে সন্তান এলেও তাঁদের দাম্পত্য জীবন খুব একটা সুখের হয়নি। পেশাগত সাফল্য এবং ব্যক্তিগত আদর্শের সংঘাত তাঁদের সম্পর্কের মাঝে দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সেই সময় অপর্ণা সেনের অভিনয় জীবনের গ্রাফ ছিল মধ্যগগনে। ‘মেম সাহেব’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘জীবন সৈকতে’ বা ‘সোনার খাঁচা’র মতো একের পর এক সুপারহিট ছবি উপহার দিচ্ছিলেন তিনি। তাঁর এই আকাশচুম্বী সাফল্য এবং স্বাধীনচেতা ব্যক্তিত্বই সম্ভবত তাঁদের বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মাত্র আট বছর টিকে ছিল তাঁদের এই দাম্পত্য। ১৯৭৪ সাল নাগাদ আইনত বিচ্ছেদ ঘটে সঞ্জয় ও অপর্ণার। তবে গল্পের শেষ এখানেই ছিল না, এই বিচ্ছেদের পরিণতি ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক। বিচ্ছেদের কয়েক বছর পর, অর্থাৎ ১৯৭৭-৭৮ সাল নাগাদ আসানসোলের একটি হোটেলে একাকী অবস্থায় আত্মহত্যা করেন সঞ্জয় সেন। জানা যায়, আগের দিন বিকেলে তিনি হোটেলের একটি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন এবং পরের দিন সকালে দীর্ঘক্ষণ সাড়াশব্দ না পেয়ে দরজা ভেঙে তাঁর দেহ উদ্ধার করা হয়। একজন প্রতিশ্রুতিমান সৃজনশীল মানুষের এমন অকাল ও করুণ পরিণতি সেই সময় অনেককেই শোকাহত করেছিল। অপর্ণা সেনের জীবনের এই অধ্যায়টি আজও অনেকের কাছে এক রহস্যময় ও বিষাদমাখা স্মৃতি হয়ে আছে।
আরও পড়ুনঃ নতুন পথ বেছে নিলেন রূপঞ্জনা মিত্র! ২০২৬-এ সাহসী সিদ্ধান্ত অভিনেত্রীর! পাশে রয়েছেন রাতুল! কি করতে চলেছেন তিনি?
সঞ্জয় সেনের মৃত্যুর পর অপর্ণা সেনের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি লেখক ও সাংবাদিক মুকুল শর্মাকে বিয়ে করেন, যাঁর সঙ্গে তাঁর কন্যা কঙ্কনা সেন শর্মার জন্ম হয়। কঙ্কনা নিজেও বর্তমানে ভারতীয় চলচ্চিত্রের একজন প্রতিষ্ঠিত তারকা। মুকুল শর্মার সঙ্গে বিচ্ছেদের পর অপর্ণা পরবর্তীকালে অধ্যাপক কল্যাণ রায়কে বিয়ে করেন, যিনি বর্তমানে অপর্ণার সুযোগ্য জীবনসঙ্গিনী। জীবনের নানা চড়াই-উতরাই এবং একাধিক সম্পর্কের বাঁক পেরিয়ে আসলেও, অপর্ণা সেন আজও তাঁর নামের সঙ্গে সঞ্জয় সেনের স্মৃতিটুকু পদবীর মাধ্যমে জড়িয়ে রেখেছেন। পর্দার পিছনের এই বাস্তব জীবনের গল্পটি যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্যের চেয়েও কম রোমাঞ্চকর নয়।

