গল্পের সাথে মিলে গেল জীবনের শেষ অঙ্ক!নিজের মৃ’ত্যু কথা আগেভাগেই জেনে গিয়েছিলেন রাহুল? ৮ বছর আগে তাঁর কলমে ফুটে ওঠা সেই আশ্চর্য ভবিষ্যৎবাণী! মিলে গিয়েছে বয়সটাও!

জনপ্রিয় টলিউড (Tollywood) অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) অকালপ্রয়াণ যেন কোনো এক ট্র্যাজেডি ফিল্মের চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। গত ২৯শে মার্চ ওড়িশার তালসারিতে শুটিং চলাকালীন এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় জলে ডুবে মৃত্যু হয় ৪৩ বছর বয়সী এই অভিনেতার। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে তাঁরই লেখা একটি ছোটগল্প ‘বান্ধবীরা’। পাঠকদের অবাক করে দিয়ে সেই গল্পের শুরুর লাইনেই অভিনেতা লিখেছিলেন, ‘মৃত্যুর পর নিজেকে বেশ রাজকীয় লাগছে আমার। এমনিতেই মৃত্যুটা বেমক্কা হয়েছে।’ গল্পের এই লাইনগুলো যেন তাঁর বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির এক করুণ প্রতিফলন।
গল্পের সাথে বাস্তবের মিল এখানেই শেষ নয়। ‘বান্ধবীরা’ গল্পে রাহুল লিখেছিলেন বিয়াল্লিশ বছর বয়সে চলে যাওয়ার কথা। বাস্তবেও ৪৩ বছর বয়সে (জন্ম: ১৬ অক্টোবর ১৯৮৩) চিরবিদায় নিলেন তিনি। গল্পের কথক বর্ণনা করছেন কীভাবে তিনি ‘জল থেকে বেরিয়ে এলেন’ এবং অন্যরা তাঁর শরীর তুলছে ঠিক যেভাবে তালসারির সমুদ্র সৈকত থেকে নিথর রাহুলকে উদ্ধার করেন তাঁর সহকর্মীরা। এই অবিশ্বাস্য মিল দেখে অনুরাগীরা বলছেন, অভিনেতা কি তবে নিজের অজান্তেই নিজের প্রয়াণের পূর্বাভাস দিয়ে গিয়েছিলেন? সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন এই গল্পের অংশটুকু মানুষের আবেগ ও বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অভিনেতা হিসেবে রাহুলের যাত্রা শুরু হয়েছিল থিয়েটারের মঞ্চ থেকে। বাবা বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের থিয়েটার গ্রুপ ‘বিজয়গড় আত্মপ্রকাশ’-এ মাত্র তিন বছর বয়সে হাতেখড়ি। তবে ২০০৮ সালে রাজ চক্রবর্তীর ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবিতে তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা তাঁকে রাতারাতি তারকায় পরিণত করে। এরপর ‘জুলফিকার’, ‘ব্যোমকেশ ফিরে এল’, ‘না হন্যতে’ এবং সম্প্রতি ‘হরগৌরী পাইস হোটেল’-এর মতো ধারাবাহিকে তাঁর সাবলীল অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। অভিনেতা হিসেবে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা ছিল কঠোর পরিশ্রম আর মেধার সংমিশ্রণ।
পর্দার অভিনয়ের বাইরে রাহুল ছিলেন একাধারে লেখক ও তাত্ত্বিক মনস্ক মানুষ। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে বই পড়া এবং লেখালেখির প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। কেবল ‘বান্ধবীরা’ নয়, এর আগে তাঁর লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘যে জানলাগুলোর আকাশ ছিল’ নাটকটিও মঞ্চস্থ হয়েছে। এছাড়াও তাঁর নিজস্ব পডকাস্ট ‘সহজ কথা’-র মাধ্যমে তিনি নিয়মিত সমসাময়িক বিষয় ও সাহিত্য নিয়ে নিজের মতামত জানাতেন। অভিনেতার পাশাপাশি একজন চিন্তাশীল লেখক হিসেবে তাঁর এই সত্তাটি ছিল অত্যন্ত প্রখর, যা তাঁর প্রয়াণের পর আজ আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ‘বন্ধ হোক ধারাবাহিক, একটা অভিশপ্ত…’ ‘দায়িত্ব জ্ঞানহীন কর্তৃপক্ষ, আর এই ধারাবাহিক দেখতে চাই না!’ অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃ’ত্যুতে ধারাবাহিক কর্তৃপক্ষের উপর ক্ষেপে গেলেন দর্শক!
ব্যক্তিগত জীবনে রাহুল ছিলেন স্পষ্টবক্তা এবং আবেগপ্রবণ। অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের সঙ্গে তাঁর প্রেম, বিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে বিচ্ছেদ ও পুনরায় এক হওয়া— সবকিছুই ছিল সংবাদপত্রের শিরোনামে। তাঁদের একমাত্র সন্তান সহজকে ঘিরেই ছিল তাঁর জগত। মৃত্যুর আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি কাজের মধ্যেই ছিলেন, শুটিং করছিলেন ‘ভোলেনাথ পার করবে’ ধারাবাহিকের জন্য। রাহুলের এই অকাল চলে যাওয়া কেবল টলিউডের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি নয়, বরং একজন সৃষ্টিশীল মানুষের অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়া এক মহাকাব্য।

