মহানায়িকার তকমা থেকে শুরু করে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা, তবু গৃহবন্দী ছিলেন অভিনেত্রী সুচিত্রা সেন, জানেন কী ছিল তার কারণ?

স্বেচ্ছা নির্বাসন একটা সাধনা। একলা থাকা মানেই একাকীত্বে ভোগা নয়, বরং একলা যাপন অনেক সময়েই আরও বৃহত্তর সাধনার পরিচায়ক হয়। মহানায়িকা সুচিত্রা সেন সেই সাধনাতেই ব্রতী ছিলেন। তার জন্য সেসময়ে তাঁকে কম ব্যঙ্গ, কটু কথা, অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়নি। কেউ বলেছে নিজের বাজার পড়ে যাচ্ছে জেনে নির্বাসন, কেউ বলেছে শ্বেতী হয়ে গেছে, কেউ আবার রটিয়েছে ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে ম্যাডামের, তাই স্বেচ্ছা নির্বাসন। কেউ বা বলেছে বিগতযৌবনা নায়িকা হয়ে গেলে সরে যেতেই হয়। কিন্তু এসব কোনও কিছুই টলাতে পারেনি সুচিত্রার সাধনা। তিনি নিজের চিত্তে অবিচল থেকেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ আর সারদা মায়ের পায়ে মন ফেলে রেখে।
সুচিত্রার জীবনের অনেক অজানা কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু তাঁর পরিবারের সদস্যরাও ভাঙেননি অন্তরালের সিদ্ধান্তের কারণ। তবে সুচিত্রা সেনের কেরিয়ারের শেষের দিক পর্যালোচনা করলে কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায় এর কারণ। উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন অনস্ক্রিন একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। তাঁদের জুটি এতটাই বিখ্যাত ছিল, এখনও অবধি মানুষ প্রেমিক ও প্রেমিকার জুটির উপমা হিসাবে বেছে নেন উত্তম ও সুচিত্রাকে। সুচিত্রা ছাড়াও উত্তম বহু নায়িকার সাথে অভিনয় করলেও সুচিত্রার আগমন তাঁকে সম্পূর্ণ করত। অপরদিকে সুচিত্রা , অন্যান্য নায়কের সাথে হিন্দি ও বাংলা ফিল্মে অভিনয় করলেও উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর জুটি বাঙালিকে মুগ্ধ করত। কিন্তু বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির আকাশে হঠাৎই ঘটিয়ে এল কালো মেঘ। মহানায়ক উত্তম কুমারের অকালপ্রয়াণ ঘটল। ভেঙে গেল বাঙালির চিরকালীন উত্তম-সুচিত্রা জুটি। রয়ে গেল একরাশ নস্টালজিয়া। কিন্তু সুচিত্রা ছিলেন পেশাদার অভিনেত্রী। অথচ তাঁর পেশাদারিত্ব পেল না মর্যাদা।
তথাকথিত সুচিত্রানুরাগীদের মনে হল, উত্তম ছাড়া সুচিত্রা গ্রহণযোগ্য নন। পরমাসুন্দরী সুচিত্রার বয়স ও তাঁর চেহারা নিয়ে কটাক্ষ হল ‘ফরিয়াদ’ ফিল্মের মুক্তির পর। ‘ফরিয়াদ’-এ সুচিত্রার চরিত্রটি ছিল এক মায়ের, যিনি সন্তানকে মানুষ করতে, তাকে পড়াশোনা করাতে অবলীলায় রাতের পর রাত বারে গান গাইতেন। সেই সময় চরিত্রের প্রয়োজনে সুচিত্রা বিশেষ কিছু পোশাক পরলেও, সেগুলি তেমন খোলামেলা ছিল না। কিন্তু মেয়েদের ‘কুড়িতে বুড়ি’ মনে করা সমাজ সুচিত্রার সেরা অভিনয়কে অনুভব করল না। তাঁকে বয়স ও চেহারা নিয়ে অপমানিত করল। মুখ বুজে কিছুদিন সহ্য করেছিলেন সুচিত্রা। ভেবেছিলেন, মানুষ হয়তো ভুল বুঝবে। কিন্তু তিনি জানতেন না, এক নারীকে সঠিক মর্যাদা দিতে শেখেনি সমাজ। ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পেল। অসাধারণ অভিনয় সত্ত্বেও সফল হননি সুচিত্রা। প্রকৃত সত্য হল সফল হতে দেওয়া হয়নি। অন্তরালে চলে গেলেন সুচিত্রা।
একজন মহিলার অত্যন্ত দুর্বল স্থান, তাঁর চেহারা নিয়ে কটাক্ষের অস্ত্রকে বেছে নিয়ে অবলীলায় সুচিত্রাকে অপমান করে তাঁকে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। মুখ খোলেননি সুচিত্রা। স্বভাবসিদ্ধ অভিমানে চুপ করে থেকেছেন। বুদ্ধিদীপ্ত সুচিত্রা জানতেন, তিনিই মহানায়িকা। তাঁর স্থান দর্শকদের মণিকোঠায় চিরন্তন। তাই আজও টলিউডের রানী নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর রাজপাট, সুচিত্রার জীবনের নিয়ে কৌতুহল। মুকুট পড়ে আছে, রানী সশরীরে না থেকেও রয়ে গেছেন রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সুচিত্রার প্রয়াণ হয় না। তিনি এক চিরকালীন আত্মবিশ্বাসী নারীর প্রতিভূ।
২০১৪ সালের ১৭ ই জানুয়ারি কলকাতার বেসরকারি নার্সিংহোম বেলভিউ-এর বুকে ভেঙে পড়েছিল ভিড়। সে ছিল এক মহাযাত্রা। পিছনে ছেড়ে যাওয়া এক সংসার। সদ্য প্রয়াতা মহানায়িকা সুচিত্রা সেন (Suchitra Sen)-কে একঝলক দেখতে চেয়েছিলেন কলকাতাবাসী। অধিকাংশ মানুষ ভেবেছিলেন, এতদিনের সযত্নে তৈরি অন্তরাল এবার হয়তো ভেঙে যাবে। শেষবারের মতো সকলে দেখতে পাবেন মহানায়িকার মুখশ্রী। কিন্তু তিনি সুচিত্রা সেন, মৃত্যুতেও ভাঙলেন না আড়াল। সাদা বেনারসি পরিহিত, মাথায় ঘোমটা সুচিত্রা নিজেকে আড়ালে রেখেই যাত্রা করলেন মহাসিন্ধুর ওপারে।

