‘আমাদের ভদ্রতাকে দুর্বলতা ভাববেন না!’ ‘নিজেদের মাটিতেই বাঙালির রুটি-রুজি কেড়ে নিচ্ছে বলিউড!’ বলিউড আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক সাহেব ভট্টাচার্য!

টলিউডের (Tollywood) অত্যন্ত পরিচিত এবং প্রতিভাবান অভিনেতা সাহেব ভট্টাচার্য (Saheb Bhattacharya)। বিখ্যাত ফুটবলার সুব্রত ভট্টাচার্যের সুপুত্র সাহেব বিনোদন জগতে নিজের দক্ষতা দিয়ে এক স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন। ছোটবেলায় শিশুশিল্পী হিসেবে প্রভাত রায়ের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি লাঠিতে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় তাঁর পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে টেলিভিশনের জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল ‘বন্ধন’-এর মাধ্যমে তিনি লাইমলাইটে আসেন। তবে সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চরিত্র তোপসে হিসেবে অভিনয় করে তিনি বাঙালি দর্শকের মনে স্থায়ী আসন করে নেন। এছাড়া অপর্ণা সেনের ইতি মৃণালিনী, কৌশিক গাঙ্গুলীর খাদ এবং মহেশ মাঞ্জরেকারের আমি সুভাষ বলছি-র মতো ভিন্নধারার চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বাংলা সিনেমার হল বন্টন এবং বলিউডের একচেটিয়া আধিপত্য নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করে নতুন করে চর্চায় এসেছেন এই অভিনেতা।

বিগ বাজেট হিন্দি সিনেমা পাঠান মুক্তির আবহে প্রেক্ষাগৃহের অসম বণ্টন নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে সাহেব ভট্টাচার্য সরাসরি আঙুল তুলেছেন মুম্বাইয়ের ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থার দিকে। তিনি বলেন, “মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় এসি ঘরে বসে একজন প্রযোজক বা ডিস্ট্রিবিউটর ঠিক করে দিচ্ছেন যে পশ্চিমবঙ্গের কোনো একটি আঞ্চলিক সিনেমা হলে বাংলা সিনেমা চলবে কি চলবে না।”

সাহেবের এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ গভীর ও অত্যন্ত বাস্তবসম্মত। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, আঞ্চলিক স্তরের সিনেমা হলগুলোর ওপর স্থানীয় দর্শকদের এবং প্রযোজকদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। সুদূর মুম্বাইয়ে বসে কর্পোরেট শক্তি ঠিক করছে বাংলার কোনগরের মতো মফস্বলের হলের দর্শক কী ছবি দেখবেন। এটি আসলে সংস্কৃতির ওপর এক ধরণের পরোক্ষ পুঁজিবাদের আগ্রাসন, যা আঞ্চলিক ছবির বাজারকে গলা টিপে হত্যা করার শামিল। বলিউড পরিবেশকদের অন্যায় একচেটিয়া ব্যবসার শর্তের তীব্র সমালোচনা করে সাহেব নিজের ক্ষোভ উগরে দেন। সিনেমা হল মালিকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই একতরফা পলিসির বিরুদ্ধে তিনি বলেন, “হিন্দি সিনেমার ডিস্ট্রিবিউটররা শর্ত দিচ্ছেন যে যদি হলের তিনটি শো-তেই হিন্দি ছবি চালানো হয়, তবেই তারা সেই হলকে ছবি দেবেন, অন্যথায় নয়। এই মানসিকতা আসলে এক বড় দুঃসাহস, যা কলকাতার মানুষ মাথা নিচু করে মেনে নিচ্ছে।”

নিজের মাটি, নিজের ভাষা এবং নিজের রাজ্যের মানুষের রুটি-রুজি বাঁচানোর তাগিদে অভিনেতা এই আগ্রাসনকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করার ডাক দিয়েছেন। বিষয়টি যে কেবল বিনোদনের নয়, বরং অস্তিত্বের লড়াই, তা স্পষ্ট করে তিনি বলে, “বাইরের মানুষ এসে আমাদের রাজ্যে, আমাদের মাটিতে আমাদেরই জীবিকা বা রুটি-রুজি কেড়ে নিয়ে নিজেরা টিকে থাকার চেষ্টা করছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”

সাহেবের এই বিশ্লেষণটি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। একটি বাংলা সিনেমা তৈরি হওয়ার পেছনে শত শত বাঙালি টেকনিশিয়ান, দিনমজুর, জুনিয়র আর্টিস্ট ও হল কর্মচারীদের রুজি-রোজগার জড়িয়ে থাকে। বাইরের ইন্ডাস্ট্রি যদি এসে সমস্ত ব্যবসা একচেটিয়াভাবে দখল করে নেয়, তবে স্থানীয় চলচ্চিত্র শিল্প পুরোপুরি দেউলিয়া হয়ে পড়বে। নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের অধিকার হারানোর এই চরম বাস্তবকে সাহেব অত্যন্ত কড়া ভাষায় ধিক্কার জানিয়েছেন, যা প্রত্যেক আঞ্চলিক ভাষাভাষী মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত করে।

বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সাহেব ভারতের অন্যান্য রাজ্যের উদাহরণ টেনে বাংলার প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে গভীর হতাশা এবং তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। দক্ষিণ বা পশ্চিম ভারতের মতো কঠোর আঞ্চলিক নীতি বাংলায় কেন নেই, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি ক্ষোভের সাথে জানতে চান “তামিলনাড়ু, ওড়িশা, পাঞ্জাব এমনকি খোদ মহারাষ্ট্রেও এই ধরনের একচেটিয়া দাপট অন্য আঞ্চলিক ছবির ওপর চালানো সম্ভব নয়, কিন্তু বাংলায় সেটা অনায়াসেই ঘটে যাচ্ছে। আমাদের রাজ্যের ল-মেকার কোথায়?”

আরও পড়ুনঃ ‘হাসপাতালে থাকাকালীন মেয়ের যখন জ’ন্ডিস ধরা পরে তখন…’ ‘ওই কান্নার আওয়াজটা শুনে বুকটা…’ মেয়ের জন্মের সেই মুহূর্ত আজও ভোলেননি জয়শ্রী! মাতৃত্ব নিয়ে আবেগঘন স্মৃতি ভাগ করলেন অভিনেত্রী!

সাহেবের এই শেষ প্যারার বিশ্লেষণটি পুরো ব্যবস্থার খামতিকে নগ্ন করে দেয়। দক্ষিণ ভারতে আঞ্চলিক ছবিকে বাঁচানোর জন্য সরকারের কড়া নিয়ম রয়েছে, সেখানে চাইলেই হিন্দি ছবি আঞ্চলিক ছবির শো কেড়ে নিতে পারে না। এমনকি মহারাষ্ট্রেও মারাঠি ছবির জন্য প্রাইম টাইম স্লট বাধ্যতামূলক। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এই ধরণের কোনো আইন বা কড়া প্রশাসনিক নজরদারি না থাকায় হিন্দি ছবির ডিস্ট্রিবিউটররা অনায়াসে পার পেয়ে যাচ্ছে। সাহেব সরাসরি রাজ্যের আইন প্রণেতা ও আমলাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে মূলত এই দাবিই জানিয়েছেন যে, অবিলম্বে আইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাংলা সিনেমা ও তার সাথে যুক্ত মানুষদের এই অসম প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা হোক।

Back to top button