‘আমি রিয়েল লাইফের খলনায়ক নই!’ ‘হাতে কাজ নেই তাই…!’ মিথ্যে রটনা, অন্যদিকে কাজ না থাকার যন্ত্রণা! সমস্ত বিতর্ক উড়িয়ে নীরবতা ভাঙলেন অভিনেতা সম্রাট মুখোপাধ্যায়!

অভিনয় জগতের অন্যতম পরিচিত মুখ সম্রাট মুখোপাধ্যায় (Samrat Mukherjee)। দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে তিনি টলিউডের ফিল্ম এবং টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত রয়েছেন। শুধু একজন দক্ষ অভিনেতা হিসেবেই নয়, অভিনয় শিক্ষার একটি নামী প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি মফস্বল থেকে কলকাতায় আসা মেয়েদের জন্য একটি সুরক্ষিত লেডিস হোস্টেলও চালান তিনি। পর্দায় খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করলেও, বাস্তব জীবনে তিনি অত্যন্ত পরোপকারী ও যত্নশীল মানুষ হিসেবেই পরিচিত। তবে সম্প্রতি তাঁর জীবনে একের পর এক আইনি ও পারিবারিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন এই প্রবীণ অভিনেতা। সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত কুৎসা এবং ভুল প্রচারের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সড়ক দুর্ঘটনা এবং মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ নিয়ে অবশেষে নীরবতা ভেঙেছেন সম্রাট বাবু। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের সেই ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনার পর মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার করা হয়েছিল যে অভিনেতা মদ্যপ অবস্থায় প্রায় ৯০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া মামলার চার্জশিটে সম্পূর্ণ অন্য তথ্য সামনে এসেছে। অভিনেতা অত্যন্ত স্বস্তির সাথে জানিয়েছেন যে, তাঁর মেডিকেল বা রক্ত পরীক্ষায় এক ফোঁটা অ্যালকোহলের অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। এছাড়া মাহিন্দ্রা কোম্পানির পক্ষ থেকে জমা দেওয়া ফরেনসিক রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে দুর্ঘটনার সময় তাঁর গাড়ির গতিবেগ ছিল মাত্র ৫২ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা, যা গভীর রাতে অত্যন্ত স্বাভাবিক। সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে যে সাইডে একটি ওলা গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার কারণে তিনি নিজের নির্দিষ্ট লেনেই সোজা যাচ্ছিলেন, বরং একটি মোটরবাইক উল্টোদিক থেকে ওভারটেক করতে গিয়েই অভিনেতার গাড়িতে সজোরে ধাক্কা মারে।
জনপ্রিয় মানুষদের নিয়ে কীভাবে সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া কোনো প্রমাণ ছাড়াই নেতিবাচক প্রচার শুরু করে, এই ঘটনাটি তারই একটি বড় উদাহরণ। অভিনেতা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, ঘটনার আসল সত্য বা পুলিশের তদন্তের জন্য অপেক্ষা না করেই অনেক সাধারণ মানুষ এবং মিডিয়া কেবল ‘ভিউ’ বা ‘রিচ’ বাড়ানোর জন্য তাঁর নামে কুৎসা রটিয়েছিল। চেনা মুখদের অপদস্ত করে টিআরপি কামানোর এই প্রবণতাকে তিনি সমাজ ও বিনোদন জগতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেন। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উপার্জিত টাকা দিয়ে কেনা শখের জিনিস বা গাড়ি যখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন একজন সেলিব্রিটির বুকেও যে সমপরিমাণ কষ্ট হয় এবং চোখ দিয়ে জল পড়ে সেই মানবিক দিকটা বিচার করার জন্য তিনি দর্শকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। আইনের ওপর ভরসা রেখে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কাউকে সামাজিকভাবে বয়কট বা দোষী সাব্যস্ত করা বন্ধ হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।
দুর্ঘটনার পাশাপাশি টলিউড তথা বিনোদন জগতের বর্তমান অন্ধকার দিক এবং কাজ না পেয়ে বিভিন্ন তরুণ শিল্পী ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়েও অভিনেতা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ না পেয়ে কিছু চেনা মুখের আত্মঘাতী হওয়ার খবর আমাদের সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং সিনিয়র অভিনেতা হিসেবে সম্রাট মুখোপাধ্যায় জানান যে, তাঁর নিজের অভিনীত শেষ ধারাবাহিকটি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসেই শেষ হয়ে গেছে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তিনিও বাড়িতেই বসে আছেন এবং নতুন কোনো কাজ পাননি। অনেকগুলো অফার এলেও চিত্রনাট্য বা চরিত্র পছন্দ না হওয়ার কারণে তিনি কাজগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, একজন প্রথম সারির অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনিও বর্তমানে দীর্ঘদিনের কাজের অভাব এর মধ্য দিয়েই যাচ্ছেন।
আরও পড়ুনঃ ‘অহংকার মাথায় চড়লে মানুষের বুদ্ধিটাই আগে নষ্ট হয়!’ পাশে শিলাজিৎ! কাকে উদ্দেশ্য করে এমন কথা বলেলন অপরাজিতা আঢ্য?
তবে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কীভাবে নিজেকে ইতিবাচক ও ডিপ্রেশন-মুক্ত রাখা যায়, তার একটি দারুণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন সম্রাট বাবু। তিনি মনে করেন, অর্ধেক জল ভর্তি গ্লাসের মতো আমাদের সবসময় জীবনের ইতিবাচক বা ব্রাইটার সাইডটার দিকেই তাকানো উচিত। কাজ না থাকার সময়টাকে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল বা ডিরেক্টরের ওপর ক্ষোভ উগরে না দিয়ে নিজের অভিনয় ইনস্টিটিউটের ক্লাস নেওয়া এবং অন্যান্য গঠনমূলক কাজে ব্যয় করেন। নিজেকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত রাখার কারণেই ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদ তাঁকে ছুঁতে পারে না। বিনোদন জগতের সমস্ত সহকর্মী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা জীবনে কাজের ক্ষেত্রে বড় কোনো বিরতি বা কঠিন সময় আসলে ভেঙে না পড়ে ধৈর্য ধরা উচিত, কারণ ঈশ্বরের ওপর ভরসা রাখলে এই অন্ধকারের পরেই একটি বিরাট পজিটিভ সুযোগ অপেক্ষা করে থাকে।

