‘টলিউডে আর চলবে না দাদাগিরি!’ ‘সরকারকে যা ইচ্ছা গালাগালি দিক, নাটক নাটকের মতোই মঞ্চস্থ হবে!’ সরকারের সমালোচনা হলে নিজের আদর্শে অনড় অভিনেত্রী! টলিউডের স্বচ্ছতা আনতে রূপা গাঙ্গুলীর কঠোর পদক্ষেপ!

জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেত্রী ও বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রূপা গাঙ্গুলী (Roopa Ganguly) বরাবরই তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং আপসহীন মনোভাবের জন্য পরিচিত। আশির দশকের শেষভাগে দূরদর্শনের মহাকাব্যিক ধারাবাহিক ‘মহাভারত’-এ দ্রৌপদীর চরিত্রে তাঁর অনবদ্য অভিনয় তাঁকে আপামর ভারতবাসীর হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছিল। এরপর ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘অসুখ’, ‘বাড়িওয়ালী’ থেকে শুরু করে গৌতম ঘোষের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি পরবর্তীতে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হিসেবেও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিনোদন জগৎ এবং সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্র উভয় জায়গাতেই তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও অবাধ যাতায়াত রয়েছে, যার ফলে সংস্কৃতির মুক্তি ও শিল্পীদের অধিকার নিয়ে তাঁর যেকোনো মন্তব্যই সর্বমহলে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সম্প্রতি ডিজিটাল মাধ্যমে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে রূপা গাঙ্গুলী বাংলার বর্তমান সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং শিল্পীদের বাক্স্বাধীনতা নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বর্তমান সময়ের অন্যতম বিতর্কিত ‘ব্যান’ বা নিষিদ্ধকরণের সংস্কৃতির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। রূপার মতে, কথায় কথায় কোনো সিনেমা, নাটক বা শিল্পকলাকে সেন্সর করা বা তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার এই প্রবণতা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এই ক্ষতিকর সংস্কৃতির অবসান হওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি এবং তিনি আশাপ্রকাশ করেছেন যে, এই ধরনের জোরপূর্বক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেওয়ার দিন এবার পুরোপুরি শেষ হতে চলেছে।
বাংলা বিনোদন দুনিয়া ও নাট্যক্ষেত্রের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে এই প্রবীণ অভিনেত্রী জানান, বাংলা সিনেমার যে ঐতিহ্য ও নিজস্ব সত্তা রয়েছে, তা আবারও স্বমহিমায় ফিরে আসছে। একটা সময় ছিল যখন বাংলার থিয়েটার ও চলচ্চিত্র সমাজকে পথ দেখাত, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠত। রূপা বিশ্বাস করেন, সেই হারিয়ে যাওয়া সোনালী দিন এবং শৈল্পিক চেতনা আবারও টলিউড ও বাংলার সংস্কৃতি মহলে পুনরুত্থিত হচ্ছে। শিল্পীরা তাঁদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে যেকোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক বার্তা কোনো ভয় ছাড়াই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন, সেই পরিবেশ তৈরি হওয়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।
বক্তব্যকে আরও স্পষ্ট করতে গিয়ে রূপা গাঙ্গুলী থিয়েটার বা নাটকের মঞ্চায়নের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি সাফ জানান যে, নাটককে সম্পূর্ণ তার নিজের নিয়মেই মঞ্চস্থ হতে দিতে হবে; সেখানে কোনো বাহ্যিক রাজনৈতিক চাপ বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ মেনে নেওয়া হবে না। শিল্পীর স্বাধীনতার পরিধি কতটা হওয়া উচিত, তা বোঝাতে গিয়ে তিনি অত্যন্ত সাহসী ভঙ্গিতে বলেন যে, কোনো শিল্পী বা নাট্যকার যদি চান, তবে তিনি বর্তমান সরকারকে লক্ষ্য করে যেকোনো ধরণের তীব্র সমালোচনা করতে পারেন, এমনকি যা ইচ্ছা গালাগালিও দিতে পারেন। গণতান্ত্রিক দেশে সরকারের সমালোচনা করা এবং নাটকের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থার ভুলত্রুটি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়াটা একজন শিল্পীর মৌলিক অধিকার, যা কোনোভাবেই খর্ব করা উচিত নয়।
আরও পড়ুনঃ চারিদিকে শুধু সম্রাটের প্রশংসা! জামাই হিসেবে সম্রাটকে মনে ধরল শ্রীনিবাসের! তবুও কোন আশঙ্কায় কাঁপছে ঝিনুকের মন?
শিল্পের এই অবাধ স্বাধীনতা ও রূপা গাঙ্গুলীর এমন মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই বিনোদন জগৎ এবং রাজনৈতিক মহলে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে যেখানে প্রায়শই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে বহু নাটক বা চলচ্চিত্রের প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, সেখানে রূপার এই অবস্থানকে বহু সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ সাধুবাদ জানিয়েছেন। শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শিল্পকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেওয়ার এই দাবি আগামী দিনে বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলনে কতটা প্রভাব ফেলে এবং টলিউডের সামগ্রিক পরিবেশকে কতটা মুক্ত করতে পারে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

