‘বেঁচে থাকতে এক আর মা’রা গেলেই আরেক!’ ‘জীবন্ত রাহুলকে অবজ্ঞা, মৃ’ত রাহুলকে স্তুতি!’ ‘যোগ্য সম্মান পাননি বেঁচে থাকতে, আজ মা’রা যেতেই এই নাটক?’ রাজ চক্রবর্তীর মুখে রাহুলের প্রশংসা শুনে ক্ষেপলেন দর্শক!

সম্প্রতি অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Banerjee) প্রয়াণে শোকাতুর টলিউড (Tollywood)। পরিচালক রাজ চক্রবর্তীকেও (Raj Chakraborty) দেখা গিয়েছে সংবাদমাধ্যমের সামনে রাহুলের ভূয়সী প্রশংসা করতে। তিনি রাহুলকে ‘অসাধারণ অভিনেতা’ এবং ‘ব্রিলিয়ান্ট’ তকমা দিয়েছেন। কিন্তু এই শোকবার্তার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে না তো সেই তিক্ত অতীত? ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরলে দেখা যায়, যে ‘চিরদিন তুমি যে আমার’ ছবি রাহুলকে রাতারাতি জনপ্রিয়তা দিয়েছিল, সেই ছবির সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছিল রাজ-রাহুল দ্বন্দ্ব। সেই সময় রাজ চক্রবর্তীর একাধিক মন্তব্য রাহুলের কেরিয়ারে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছিল।
তৎকালীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সাক্ষাৎকারে রাজ চক্রবর্তী রাহুলের শৃঙ্খলাবোধ ও ব্যবহার নিয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন। পরিচালক তখন দাবি করেছিলেন যে, সাফল্যের পর রাহুলের আচার-আচরণ বদলে গিয়েছে এবং তিনি আর আগের মতো পরিশ্রমী নেই। একজন নবাগত অভিনেতার সম্পর্কে সেই সময়কার এমন নেতিবাচক মন্তব্য রাহুলের পেশাদার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। অথচ আজ রাহুলের মৃত্যুর পর সেই একই পরিচালকের গলায় শোনা যাচ্ছে শোকের সুর, যা দেখে অনেকেই একে ‘মডেল অফ কনভিনিয়েন্স’ বা সুবিধাবাদী আচরণ হিসেবে দেখছেন।
ইন্ডাস্ট্রির একাংশ মনে করছে, অভিনেতার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করা এক জিনিস, আর তাঁর অভিনয় দক্ষতা নিয়ে অতীতের মন্তব্য অস্বীকার করা অন্য জিনিস। আজ রাজ বলছেন যে রাহুল দারুণ অভিনেতা ছিলেন, কিন্তু অতীতে তিনি রাহুলের কাজ বা তাঁর ব্যক্তিত্ব নিয়ে যে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন, তা কি কেবল সাময়িক রাগ ছিল নাকি পেশাদার ঈর্ষা? রাজের এই ভোলবদল প্রমাণ করে যে, বিনোদন জগতে সম্পর্কের কোনো স্থায়ী জায়গা নেই। এখানে মানুষের মূল্যায়নের মাপকাঠি সময়ের সাথে সাথে এবং নিজের স্বার্থ অনুযায়ী বারবার পরিবর্তিত হয়।
রাজ চক্রবর্তীর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি শিল্পীদের ‘স্ট্রং’ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং নিজের নিরাপত্তার কথা নিজেদেরই ভাবতে বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কোনো অভিনেতা যখন তাঁর প্রথম পরিচালকের কাছ থেকেই প্রবল সমালোচনার সম্মুখীন হন, তখন তাঁর মানসিক অবস্থা বা কেরিয়ারের নিরাপত্তা কোথায় থাকে? রাজের কথায় যে ‘নিজে সেফ থাকার’ কথা বলা হচ্ছে, তা কি কেবল শারীরিক নিরাপত্তা, নাকি মানসিক হেনস্থা থেকে মুক্তির উপায়ও? রাহুলের সাফল্যের কারিগর দাবি করা রাজ যখন একসময় তাঁর নামেই কটু কথা বলেন, তখন সেই দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুনঃ ‘আমি ম’রে গেলে কি শান্তি পাবেন? যখন বলেছিলাম তখন তো…’ রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে নিজের ছবিতে মালা দিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন জিতু কমল! কাঠগড়ায় ক্ষমতাবান প্রোডাকশন হাউস!
পরিশেষে বলা যায়, মৃত্যু সম্ভবত সমস্ত তিক্ততা ধুয়ে মুছে দেয়, অথবা এটি এক ধরণের মুখোশ যা জনসমক্ষে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সাহায্য করে। রাজ চক্রবর্তীর এই ‘এক মুখে দুই কথা’ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে টলিউড একটি জটিল গোলকধাঁধা। এখানে ব্যক্তিগত আক্রোশ আর পেশাদার প্রশংসা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। রাহুল মজুমদার আজ নেই, তাই তাঁর হয়ে প্রতিবাদ করার কেউ না থাকলেও, রাজের এই বৈপরীত্য ইন্ডাস্ট্রির নবাগতদের জন্য এক বড় শিক্ষা হয়ে রইল যে, এখানে আজ যে গুরু, কাল সেই নিন্দুক হতে কতক্ষণ।

