এক কালের দাপুটে নায়িকা, ইন্ডাস্ট্রিতে ছিল একছত্র আধিপত্য! ছেলে বৌমার হাতে অত্যাচারিত হয়েই কাটল জীবনের শেষ দিন গুলো

তার মুখে সর্বদাই লেগে থাকত একটি অমায়িক হাসি। তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে সবার কাছে হাসির দিন আমি পরিচিত ছিলেন। সহজ সরল সাধারণ একটা মানুষ। আজকের দিনের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মত অন্যকে টেক্কা দেওয়া অথবা ঈর্ষা করা প্রভৃতি মনোবৃত্তি তার মধ্যে ছিল না। তাকে সবাই ভীষণ ভালবাসত। আর এই ভালোবাসা নিয়েই জীবনে পথ চলছিলেন এই অভিনেত্রী। তিনি ছিলেন জলের মতো যে পাত্রে রাখা হতো সেই পাত্রের আঁকা নিতে পারতেন। এতটা সরল সাদাসিধে হওয়ার জন্যই বোধ হয় সব রকমের চরিত্রের সাবলীলভাবে অভিনয় করার দক্ষতা ছিল তার মধ্যে।
এই অভিনেত্রী হলেন সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়। একজন খ্যাতনামা ভারতীয় বাঙালি অভিনেত্রী যিনি বাংলা সিনেমায় তাঁর কাজের জন্য পরিচিত ছিলেন। রঞ্জিত মল্লিক, উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সন্তু মুখোপাধ্যায় এবং দীপঙ্কর দে-র মতো অভিনেতাদের সাথে তাঁর অন-স্ক্রিন জুটি জনপ্রিয়। কমেডি থেকে ট্রাজেডি, সব রকমের চলচ্চিত্রে অসামান্য অভিনয়ের মাধ্যমে মন জয় করেছিলেন দর্শকদের। তার কাজের প্রতি এতোটুকু খামতি কখনো দেখা যায়নি।
অভিনয়কে তিনি অসম্ভব ভালোবাসতেন। তাই যে চরিত্রের অভিনয় না কেন নির্দ্বিধায় ভালোবেসে নিজের সবটা দিয়ে ফুটিয়ে তুলতেন তিনি। কেবলমাত্র নায়িকা হওয়ার বাসনা কোনদিনও ছিল না তার। নায়িকা থেকে ভিলেন অথবা পার্শ্ব অভিনেত্রী সব চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। বিশেষ করে বাঙালি মধ্যবিত্ত ঘরের মা দিদি বোন শাশুড়ি এই চরিত্রগুলিতে আমরা ঠিক যেমন মানুষকে কল্পনা করি তিনি ঠিক তেমনই। তাই খুব সহজে এবং খুব তাড়াতাড়ি মানুষের অনেক কাছে চলে আসতে পেরেছেন তিনি।

সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়ের প্রথম চলচ্চিত্র ছিল “আজকের নায়ক” ১৯৭২ সালে মুক্তি পেয়েছিল। এরপর তিনি বসন্ত বিলাপ, সঙ্গিনী, দেবী চৌধুরানী, বিকেলে ভোরের ফুল, গণদেবতা, তিলোত্তমা, অমরকন্টক, কলঙ্কিনী নায়িকা, মোহনার দিকে, দাদা মনি, ইন্দিরা, ওগো বধূ সুন্দরী সব মিলিয়ে প্রায় ৫০০ টি চলচ্চিত্রে তার অভিনয়ের দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। এত গনি একজন অভিনেত্রী হওয়া সত্বেও কখনোই তার গুণের তেমন চর্চা হয়নি চলচ্চিত্র জগতে। তেমন কোন পুরস্কার এ পুরস্কৃতও করা হয়নি তাকে।
ব্যক্তিগত জীবনে কখনোই শান্তি পাননি তিনি। জীবন তাকে সমস্ত সুখ শান্তি থেকে অনেক দূরে ঠেলে দিয়েছিল। বিখ্যাত প্রযোজক শসধর মুখোপাধ্যায় ছিলেন তার প্রথম স্বামী। এরপর তাদের দুটি সন্তান হয় কিন্তু বিবাহিত জীবন সুখের না হওয়ায় বিচ্ছেদ ঘটে যায় তাদের। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর প্রযোজক রবীন্দ্রনাথ মালোত্রার সঙ্গে লিভিং রিলেশনে জড়িয়ে পড়েছিলেন অভিনেত্রী সুমিত্রা। জীবনের শেষ দিন অব্দি এই সম্পর্কের অভিশাপ তাকে বয়ে বেড়াতে হয়েছিল। শেষকালে নিদারুণ অর্থাৎ এর মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছিল তাকে যে যা চরিত্রে কাজ দিত তাই করতেন এমনও হয়েছে কাজ করেছেন কিন্তু টাকা পাননি। এসবের দরুন চরম ডিপ্রেশন থেকে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে বাংলার চলচ্চিত্র জগতকে শূন্য করে ইহলো ত্যাগ করেন সুমিত্রা দেবী। যেই মানুষটা এককালে বাংলার চলচ্চিত্র জগতের ক্ষমতা এবং দক্ষতার দারা পরিপূর্ণ করেছিল সেই মানুষটাকে প্রাপ্য সম্মান দেয়নি কেউই।

