‘টালিগঞ্জ বলেছিল অসম্ভব’, ‘হেমা মালিনীর জায়গায় আমি!’ কটাক্ষ উড়িয়ে পর্দা কাঁপিয়েছিলেন অনামিকা সাহা! টলিউডের বুকে উড়িয়েছিলেন সাফল্যের ধ্বজা!

বাংলা বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনামিকা সাহা (Anamika Saha) একটি অত্যন্ত পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম। কয়েক দশক ধরে তিনি টলিউডে কখনো মা, কখনো জাঁদরেল শাশুড়ি, আবার কখনো দজ্জাল খলনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মনে এক অবিচ্ছেদ্য জায়গা করে নিয়েছেন। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শেষে এবং দুই হাজারের দশকের শুরুতে টলিউড ইন্ডাস্ট্রি যখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন অনামিকা সাহা ছিলেন প্রতিটি হিট সিনেমার অন্যতম অপরিহার্য মুখ। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত—তদানীন্তন সকল সুপারস্টারের সঙ্গেই তাঁর সাবলীল অভিনয় পর্দা কাঁপিয়েছে। তবে তাঁর দীর্ঘ এই পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না, বরং অনেক সংগ্রাম আর প্রতিভার প্রমাণ দিয়েই তাঁকে নিজের আসন পাকা করতে হয়েছিল।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী তাঁর অভিনয় জীবনের শ্রেষ্ঠ ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড় পরিবর্তনকারী মুহূর্ত হিসেবে ১৯৯৮ সালের ব্লকবাস্টার ছবি ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’-এর অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। অনামিকা সাহা জানান, এই ছবিতে জাঁদরেল শাশুড়ির চরিত্রের প্রস্তাব পাওয়া ছিল তাঁর কাছে এক বড় পরীক্ষা। কারণ এই ছবিটি ছিল বালি ভাই পরিচালিত হিন্দি ছবি ‘জামাই রাজা’-র রিমেক, যেখানে ওই একই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বলিউডের ড্রিম গার্ল হেমা মালিনী। একজন অভিনেত্রীর কাছে হেমা মালিনীর মতো কিংবদন্তির করা চরিত্রে অভিনয় করা যেমন সম্মানের, তেমনি ছিল আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার চাপ।
অভিনেত্রী স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই সময় টালিগঞ্জ পাড়ার অধিকাংশ মানুষই এই কাস্টিং নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। অনেকেই আড়ালে বা সরাসরি পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তীকে বলেছিলেন যে তিনি ভুল করছেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, বম্বেতে যে চরিত্রে হেমা মালিনী অভিনয় করেছেন এবং যে গ্ল্যামার ছড়িয়েছেন, অনামিকা সাহা সেই গ্ল্যামার কোথায় পাবেন? ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল, “অনামিকা কি পারবে সেই ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলতে?” এমনকি পরিচালকের ‘মাথা খারাপ হয়ে গেছে’ বলেও কটাক্ষ করেছিলেন অনেকে। এই সমালোচনা অভিনেত্রীকে মানসিকভাবে কিছুটা চিন্তিত করলেও তাঁর জেদ বাড়িয়ে দিয়েছিল শতগুণ।
তবে এই কঠিন সময়ে অনামিকা সাহার পাশে পাহাড়ের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন টলিউডের তৎকালীন ‘ইন্ডাস্ট্রি’ অর্থাৎ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। তিনি পরিচালক ও সমালোচকদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, গ্ল্যামার দিয়ে সবটা বিচার করা উচিত নয়। তাঁর মতে, একজন প্রকৃত শিল্পী যদি তাঁর অভিনয় ক্ষমতা দিয়ে চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তবে সেখানে গ্ল্যামার গৌণ হয়ে যায়। প্রসেনজিতের এই অটল বিশ্বাস এবং পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তীর জেদের কারণেই অনামিকা সাহা সেই চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। বুম্বাদাই সেদিন জোর দিয়ে বলেছিলেন যে, অনামিকাকেই এই রোলে নেওয়া হবে এবং দেখা যাবে শেষ পর্যন্ত কী হয়।
আরও পড়ুনঃ বইয়ের মুখ না দেখেও চার দিনেই পুলিশ অফিসার উজি! ‘তোমার ভিডিও আমি…’ ‘এর আগেও তুমি আমার…’ সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সর ঝিলানের ট্রোলের জবাবে কী বললেন আরাত্রিকা?
শেষমেশ ছবি মুক্তির পর ইতিহাস তৈরি হয়েছিল। অনামিকা সাহা জানান, ছবি মুক্তির দিন তিনি খুব ভয় পেয়েছিলেন, কিন্তু প্রেক্ষাগৃহের সামনে মানুষের উন্মাদনা দেখে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দর্শকরা তাঁর অভিনয় দেখে পর্দার দিকে টাকা ছুড়ছিলেন—যা একজন শিল্পীর কাছে পরম প্রাপ্তি। এই একটি ছবির সাফল্য শুধু তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়নি, বরং প্রসেনজিৎ-অনামিকা জুটিকে টলিউডের অন্যতম লাকি এবং সফল জুটিতে পরিণত করেছিল। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের একসঙ্গে করা প্রায় প্রতিটি ছবিই বক্স অফিসে সাফল্যের মুখ দেখেছে, যা আজও বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে এক নস্টালজিয়া।

