‘আমি তো আর সিনেমা করব না…মানুষ আমাকে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছে!’ বড়পর্দায় ফেরার জল্পনার অবসান! সারা জীবনের মতন অভিনয় জগতকে বিদায় জানালেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়?

ভারতীয় বিনোদন জগতের ইতিহাসে তিনি এক অবিস্মরণীয় নাম। ১৯৮০-এর দশকে বি আর চোপরার মহাকাব্যিক ধারাবাহিক ‘মহাভারত’-এ ‘দ্রৌপদী’র চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গেঁথে রয়েছে। তিনি রূপা গঙ্গোপাধ্যায় (Roopa Ganguly) একাধারে জাতীয় পুরস্কারজয়ী সুদক্ষ অভিনেত্রী, বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এবং বর্তমান রাজনীতির ময়দানের এক অন্যতম লড়াকু ব্যক্তিত্ব। মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ বা গৌতম ঘোষের মতো কিংবদন্তি পরিচালকদের ছবিতে বারবার নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। রূপালী পর্দার সেই আলো-ঝলমলে দুনিয়া থেকে শুরু করে রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ এবং বর্তমানে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সোনারপুর দক্ষিণের নবনির্বাচিত বিধায়ক হিসেবে তাঁর এই যাত্রা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাঁর একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে বিনোদন এবং রাজনৈতিক মহলে।
সিনেমার চিরচেনা ক্যানভাসে তাঁকে কি আর কখনও ফিরে পাওয়া যাবে? এই প্রশ্নের উত্তরে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বেশ স্পষ্ট এবং অকপটভাবে বড়পর্দা থেকে নিজের বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানান যে, সম্ভবত আর কোনো নতুন চলচ্চিত্রে তাঁকে অভিনয় করতে দেখা যাবে না। গ্ল্যামার দুনিয়ার সমস্ত ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে তিনি এখন এক নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্রতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তাঁর কথায়, সাধারণ মানুষ এবং দল তাঁকে যে গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন, এখন সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সেই কাজের সুবিচার করাই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। অভিনয় জগতের চেয়েও এখন তাঁর কাছে মানুষের জন্য কাজ করার এই ময়দান অনেক বেশি জরুরি ও দায়বদ্ধতার।
বড়পর্দা থেকে দূরত্ব বাড়লেও শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আজন্ম টান যে এতটুকু কমেনি, তা আবারও প্রমাণিত হলো নন্দন চত্বরে তাঁর উপস্থিতিতে। দীর্ঘ বছর পর কলকাতার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রস্থল নন্দনে পা রেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন এই প্রবীণ অভিনেত্রী। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, বিগত বহু বছর ধরে কাজের সূত্রে নন্দনের সামনের উড়ালপুল বা ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করার সময় তিনি দূর থেকেই এই প্রাঙ্গণটিকে দেখতেন। দূর থেকে তাকিয়ে ভাবতেন, এটিই তো তাঁদের সেই চেনা ভালোবাসার নন্দন। এতদিন পর সেখানে সশরীরে আসতে পেরে তাঁর মন ভালো লাগায় ভরে উঠেছে। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী দিনে মানুষের সুস্থ বিনোদনের জন্য আরও অনেক অডিটোরিয়াম বা প্রেক্ষাগৃহ গড়ে উঠবে, যেখানে মানুষ মন খুলে সিনেমা ও শিল্পচর্চার আনন্দ নিতে পারবেন।
বাঙালি জীবন এবং সুস্থ সংস্কৃতির মেলবন্ধন নিয়ে এই সাক্ষাৎকারে এক গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরেন রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বিশ্বাস করেন যে সিনেমা, থিয়েটার বা যেকোনো ধরনের চারুশিল্পের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও অতপ্রত। প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রম, জীবিকার তাগিদ এবং পেশাগত ব্যস্ততার পর এই শিল্প মাধ্যমগুলোই সাধারণ মানুষের ক্লান্ত মনে শান্তির প্রলেপ দেয়। এই আর্ট ফর্ম বা শিল্পকলাই প্রকৃতপক্ষে বাঙালি তথা সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে মানসিক খোরাক জোগায় এবং বাঁচিয়ে রাখে। দৈনন্দিন একঘেয়েমি থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ যাতে একটু আনন্দের আলো দেখতে পায়, তার পেছনে সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম।
আরও পড়ুনঃ অঙ্কিতা-দেবালয় বিতর্কে নতুন মোড়! এবার অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিলেন দেবালয়! নিজের স্বপক্ষে কি কি প্রমাণ দেখালেন পরিচালক?
সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্বে এসে রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বাঙালির হারিয়ে যাওয়া এক চিরন্তন মধ্যবিত্ত ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, একটা সময় ছিল যখন প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে সন্ধে নামলেই হারমোনিয়ামের সুর আর গান-বাজনার একটা সুন্দর রেওয়াজ ছিল। প্রত্যেকে নিজের মতো করে কিছুটা হলেও সুর সাধার চেষ্টা করতেন। নিজে একজন প্রশিক্ষিত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী হওয়ায় এই অনুভূতিটি তিনি খুব গভীরভাবে অনুভব করেন। তবে সময়ের সাথে সাথে এবং আধুনিকতার ইঁদুরদৌড়ে মানুষের মজ্জাগত এই সাংস্কৃতিক অভ্যাসগুলো আজ কিছুটা স্তিমিত। আর তাই, নতুন জনপ্রতিনিধি হিসেবে সাধারণ মানুষের মনের সেই পুরনো আনন্দ, অনাবিল শান্তি এবং পারিবারিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আবারও সমাজের বুকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনাই এখন তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

