‘আমরা তো অত্যন্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে তাই আমরা বেঁচে আছি ওই…’ ‘যদি কোনো ছেলে মুদির দোকান থেকে উঠে আসে তাহলে…’ কীভাবে বেঁচে আছেন অভিনেতা! অকপটে নিজের জীবন যুদ্ধ নিয়ে চন্দন সেন!

টলিউডের (Tollywood) প্রথিতযশা অভিনেতা, নাট্যকার ও পরিচালক চন্দন সেনের (Chandan Sen) জন্ম ১৯৬৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। প্রায় চার দশকের দীর্ঘ অভিনয় জীবনে তিনি থিয়েটার, সিনেমা এবং টেলিভিশন তিন মাধ্যমেই নিজের দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। উৎপল দত্ত ও রামপ্রসাদ বণিকের ছাত্র চন্দন সেন ‘নাট্য আনান’ থিয়েটার গ্রুপ গঠন করেন। ‘ইষ্টি কুটুম’, ‘ইচ্ছেনদী’ বা ‘খড়কুটো’-র মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকের পাশাপাশি ‘মানিকবাবুর মেঘ’-এর মতো আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের মুগ্ধ করেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি একজন ক্যানসার জয়ী যোদ্ধা এবং স্পষ্টবাদী মানুষ হিসেবেও পরিচিত। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে তিনি মধ্যবিত্তের কাঁধে চেপে বসা ‘ইএমআই’ (EMI) বা কিস্তি সংস্কৃতির অন্ধকার দিকটি নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন।
চন্দন সেনের মতে, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা পুরোপুরি একটি সুপরিকল্পিত ‘নেক্সাস’ বা চক্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই চক্রটি সাধারণ মানুষকে বিলাসিতার স্বপ্ন দেখায় এবং সেই স্বপ্ন পূরণের মোড়কে তাদের হাতে ধরিয়ে দেয় ইএমআই-এর বোঝা। তিনি মনে করেন, এটি এমন এক ফাঁদ যেখানে পা দিলেই একজন মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতা এবং মেরুদণ্ড দুই-ই বিপন্ন হয়ে পড়ে। কিস্তির মাধ্যমে দ্রব্য কেনা যতটা সহজ মনে হয়, মাসের শেষে সেই টাকা মেটানোর দুশ্চিন্তা একজন মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। অভিনেতা মনে করেন, এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হলো মানুষকে ঋণের জালে আটকে রেখে তাকে সিস্টেমের দাসে পরিণত করা।
এই কিস্তি সংস্কৃতির প্রভাব যে কেবল আর্থিক নয়, বরং মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরকেও স্তব্ধ করে দেয়, সেই বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। চন্দন সেন বলেন, আমাদের বিনোদন জগতের অধিকাংশ শিল্পী বা সাধারণ কর্মীরাই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা। যখনই কেউ বুঝতে পারে যে আপনার মাথার ওপর ইএমআই-এর বোঝা রয়েছে, তখনই তারা আপনার ওপর খবরদারি করার সুযোগ পায়। যার নিজের একটি বিকল্প আয়ের উৎস বা ছোট একটি দোকান আছে, সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারে। কিন্তু যার আগামী মাসের ইএমআই মেটানো নিয়ে চিন্তা আছে, তাকে অনেক সময় মাথা নিচু করে থাকতে হয়।
এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে তিনি আধুনিক যুগের ‘স্বপ্ন’ বিক্রি করার প্রক্রিয়াটিকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তাঁর মতে, বিজ্ঞাপন এবং বিপণনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বোঝানো হয় যে উচ্চমানের জীবনযাত্রার জন্য দামী গাড়ি বা গ্যাজেট অনিবার্য। আর সেই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়েই মানুষ ইএমআই-এর নেশায় জড়িয়ে পড়ে। অভিনেতা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এই প্রক্রিয়াটি আসলে মানুষকে মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। কিস্তি মেটানোর জন্য মানুষকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হচ্ছে, যার ফলে সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত শান্তি দুই-ই আজ বিলীন হওয়ার পথে।
আরও পড়ুনঃ পর্দা থেকে আচমকাই নিখোঁজ! কোথায় হারিয়ে গেলেন টলিপাড়ার দক্ষ অভিনেতা সঞ্জীব সরকার? বর্তমানে কি করছেন অভিনেতা?
চন্দন সেনের এই বক্তব্য কেবল বিনোদন জগতের জন্য নয়, বরং গোটা সমাজের জন্যই এক সতর্কবার্তা। তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তথাকথিত ‘বিলাসিতার ফাঁদ’ থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত স্বাধীনতা ফিরে পেতে হলে আমাদের ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাঁর মতে, ঋণের বোঝা নিয়ে মাথা উঁচু করে লড়াই করা অসম্ভব। তাই আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর আহ্বান— বিলাসিতার মোহে পড়ে নিজের কণ্ঠস্বর বিক্রি না করে, বাস্তবসম্মত জীবনের পথে হাঁটাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই শক্তিশালী বার্তার মাধ্যমে চন্দন সেন প্রমাণ করেছেন যে তিনি কেবল একজন দক্ষ অভিনেতাই নন, বরং একজন সমাজ সচেতন চিন্তকও বটে।

