‘আমরা পুরনো, আমাদের কী দরকার!’ ‘বড় পরিচালকদের মতো দূরদর্শিতা এখন কই?’ পুরনোদের জায়গা নেই ইন্ডাস্ট্রিতে? টলিউড নিয়ে বি’স্ফোরক অনামিকা সাহা!

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করলেই যে ক’জন দক্ষ অভিনেত্রীর মুখ আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অনামিকা সাহা (Anamika Saha)। আশির দশক থেকে শুরু করে নব্বই বা আশির দশকের শেষের দিক কমার্শিয়াল বাংলা সিনেমা হোক বা সিরিয়াল, খলনায়িকা থেকে শুরু করে স্নেহময়ী মা কিংবা ঠাকুমার চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে দাগ কেটেছে। পর্দায় তাঁর শক্তিশালী উপস্থিতি এবং সংলাপ বলার নিজস্ব ধরণ আজও সিনেমাপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ইন্ডাস্ট্রিকে সমৃদ্ধ করার পর, আজ জীবনের এই প্রান্তে এসে বর্তমান টলিউডের কর্মপদ্ধতি নিয়ে একরাশ ক্ষোভ ও আক্ষেপ উগরে দিলেন এই সিনিয়র অভিনেত্রী।
সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে প্রবীণ অভিনেতাদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত বিস্ফোরক কিছু মন্তব্য করেছেন অনামিকা সাহা। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে পুরনো দিনের গুণী ও সিনিয়র শিল্পীদের আর আগের মতো মূল্যায়ন বা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। দর্শকরা আজও এই প্রবীণ তারকাদের পর্দায় দেখতে চান এবং তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু পাওয়ার আশা রাখেন। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিকাঠামো বা কাস্টিং সিস্টেম তাঁদের সেই সুযোগটুকু দিতেই নারাজ। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিল্পীদের এভাবে বসিয়ে রাখা বা তাঁদের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করছেন তিনি।
ইন্ডাস্ট্রির এই খামখেয়ালিপনার পেছনে অনামিকা সাহা স্পষ্ট আঙুল তুলেছেন একশ্রেণীর নতুন মানসিকতার দিকে। তিনি আক্ষেপের সুরে জানান, বর্তমান সময়ের অনেক নির্মাতা বা প্রযোজক ভাবেন যে, “ওরা তো পুরনো দিনের অভিনেতা বা অভিনেত্রী, ওদের দিয়ে এখন আর কী হবে!” অনেক সময় চরিত্র অনুযায়ী যোগ্যতার বিচার না করেই শুধুমাত্র ‘পুরনো’ তকমা দিয়ে সিনিয়রদের একপাশে সরিয়ে দেওয়া হয়। অনামিকা সাহার এই মন্তব্য টলিউডের ভেতরের সেই মানসিকতাকে প্রকাশ করে, যেখানে অভিজ্ঞতার চেয়ে বয়স বা নতুন মুখের ট্রেন্ডকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
এই অবহেলার পেছনে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বর্তমান ইন্ডাস্ট্রির ‘প্রোডাকশন হাউজ সংস্কৃতি’ বা নিজস্ব পছন্দের বৃত্ত। অভিনেত্রী খোলাখুলিভাবে অভিযোগ করেছেন যে, আজকাল অনেক হাউজ বা চ্যানেল চরিত্র অনুযায়ী সঠিক অভিনেতা খোঁজার চেয়ে নিজেদের পছন্দের মানুষদের বেশি কাজ দেয়। অর্থাৎ, যোগ্যতা বা চরিত্রের ডিমান্ডের চেয়ে “কে কার কাছের মানুষ” বা কোন প্রোডাকশন হাউজের লবিতে কে আছেন, সেটাই কাস্টিংয়ের প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, ঘরের ভেতরেই একধরণের স্বজনপোষণ বা পছন্দের বৃত্ত তৈরি হওয়ায় আসল প্রতিভারা কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আরও পড়ুনঃ ‘একজন মানুষ অনশন করে নিজের জীবন…’ সোনম ওয়াংচুককে সমর্থন জানিয়ে সরব আরাত্রিকা সিনহা! এই অসহনীয় নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ‘খুদে কমরেড’!
সবশেষে একজন প্রকৃত পরিচালকের দূরদর্শিতা কেমন হওয়া উচিত, সেই বার্তাও দিয়েছেন অনামিকা সাহা। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, আগেকার দিনের বা জেনুইন বড় ডিরেক্টররা সবসময় একটি চরিত্রের গভীরতা বুঝতেন এবং সেই চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার জন্য একদম যোগ্য অভিনেতাকে খুঁজে বের করতেন। সেখানে কোনো আপোষ চলত না। কিন্তু বর্তমান সময়ে চরিত্র অনুযায়ী নিখুঁত কাস্টিং করার সেই তাগিদটা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। প্রবীণ এই অভিনেত্রীর এমন স্পষ্ট ও অকপট বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই টলিউডের ভেতরের কাস্টিং রাজনীতি এবং সিনিয়রদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে।

