তিনবার বিয়ে! বারংবার বিচ্ছেদ! কষ্টের উপার্জিত টাকায় দুই মেয়ের ভরণপোষণ! জীবনের সঙ্গে এই কঠিন সংগ্রামে বিজয়িনী অপর্ণা সেন!

বাংলা চলচ্চিত্রে এমন বহু অভিনেতা অভিনেত্রীরা রয়েছেন যারা একাধারে অভিনয় করেছেন আবার পরিচালনা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম নাম হল বাংলা ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় অভিনেত্রী এবং পরিচালক অপর্ণা সেন। বর্তমানে তার মেয়ে কঙ্কনা সেন শর্মাও একজন দারুন জনপ্রিয় ভারতীয় অভিনেত্রী। একটা সময় অপর্ণা সেন নিজের রুপালি পর্দার যাত্রা নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে শুরু করলেও বর্তমানে তিনি একজন দারুন ভাবে জনপ্রিয় পরিচালক। তবে এত জনপ্রিয় একজন অভিনেত্রী ও পরিচালিকা হওয়া সত্ত্বেও তার জীবনের কাহিনী শুনলে সকলেই অবাক হবেন। বহু ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে তারপরে তিনি একা হাতে নিজের দুই মেয়েকে বড় করেছেন এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজ জানবো অপর্ণা সেনের জীবন কাহিনী।

১৯৪৫ সালের ২৫ শে অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্ম হয় অপর্ণা সেনের। তার বাবার নাম চিরানন্দ দাশগুপ্ত। তিনি ছিলেন একজন চলচ্চিত্র পরিচালক এবং সমালোচক। তার মায়ের নাম হল সুপ্রিয়া দাস যিনি ছিলেন প্রখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাসের খুড়তুতো বোন। অপর্ণা সেন তার ছোটবেলা কাটিয়েছেন কলকাতার হাজারিবাগে। তিনি ছোটবেলায় পড়াশোনা করেছিলেন কলকাতার মর্ডান হাই স্কুল ফর গার্লসে এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে বিএ ইংলিশ অনার্স নিয়ে ভর্তি হন কিন্তু সেই ডিগ্রি তিনি সম্পূর্ণ করেননি। খুব ছোট থেকেই অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। অনেক ছোটবেলায় নাটকে অভিনয় করতেন তিনি তার অভিনয় জীবন শুরু উৎপল দত্তের হাত ধরে।

১৯৬১ সালে প্রথম ‘তিন কন্যা’ ছবিতে অভিনয় করে তিনি সিনেমা জগতে পদার্পণ করেন। তারপরে বহু জনপ্রিয় ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন তবে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে অভিনয় করে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেন। তার অভিনীত জনপ্রিয় ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ‘এখানে পিঞ্জর’, ‘এখনই’, ‘জয়জয়ন্তী’, ‘মেম সাহেব’, ‘জীবন সৈকতে’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘সোনার খাঁচা’, ‘সুজাতা’, ‘আলোর ঠিকানা’, ‘কাজল লতা’, ‘রাগ অনুরাগ’, ‘জন অরণ্য’, ‘অজস্র ধন্যবাদ’,’মোহনার দিকে’, ‘একান্ত আপন’, ‘শ্বেত পাথরের থালা’। এছাড়া তিনি চলচ্চিত্র সমালোচকদের কাছে অত্যন্ত প্রশংসা পান বেশ কিছু ছবির জন্য। তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘ইন্দিরা’,’করি দিয়ে কিনলাম’, ‘মহা পৃথিবী’,’১৯ শে এপ্রিল’, ‘পারমিতার একদিন’, ‘তিতলি’,’অন্তহীন’, ‘চতুষ্কোণ’।
তবে তিনি সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনা করেছেন। ১৯৮১ সালের পর থেকে তিনি সিনেমা পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথম পরিচালিত ছবি হল ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ যে ছবি পরিচালনার জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। তারপরে একে একে বেশ কিছু জনপ্রিয় ছবি তিনি পরিচালনা করেছেন যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘পরমা’,’সতি’,’পারমিতার একদিন’, ‘মিস্টার এন্ড মিসেস আইয়ার’, ‘ফিফটিন পার্ক অ্যাভিনিউ’, ‘দা জাপানিজ ওয়াইফ’, ‘ইতি মৃণালিনী’, ‘গয়নার বাক্স’। তিনি দ্বিতীয় জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ‘মিস্টার এন্ড মিসেস আইআর’ এর পরিচালনা করে।
![]()
আমাদের সমাজে বহু অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছেন যারা একাধিক বার বিয়ে করেছেন কিন্তু অপর্ণা সেন যখন তিনবার বিয়ে করেন তাকে নিয়ে বহু জল্পনা উঠেছিল নানা মহলে। বহুবার তাকে সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কিন্তু এতকিছুর পরেও খুব কম মানুষ জানেন যে তিনি তার জীবনে কত কঠিন পরিস্থিতির মাধ্যমে দুই মেয়েকে বড় করে তুলেছেন। স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর একাই নিজের পথে এগিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। খুবই তরুণ বয়সে বিয়ে করেছিলেন সঞ্জয় সেনকে কিন্তু সেই বিয়ে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

এরপর বিশিষ্ট লেখক এবং সম্পাদক মুকুল শর্মাকে বিয়ে করেন তিনি। মুকুল শর্মা অপর্ণা সেনের ‘পরমা’ ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তাদের দুই মেয়ে কমলিনী এবং কঙ্কনা। সেই বিয়েও বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তারপর নিজের জীবন সংগ্রাম নিজেই চালিয়ে গেছেন অভিনেত্রী। বর্তমানে তার স্বামীর নাম কল্যাণ রায়। এত প্রতিভাবান একজন অভিনেত্রী এবং পরিচালক সব সময় সুস্থ থাকুন এবং ভালো থাকুন এই কামনাই করা যায়।


