অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছিলেন একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা সুনীল মুখোপাধ্যায়, যোগ্য সম্মান তো দূর শেষ বয়সে কেউ খোঁজ রাখেনি তার

একসময় টালিগঞ্জের জনপ্রিয় এবং অতি পরিচিত মুখ ছিলেন অভিনেতা সুনীল মুখোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রের ছোটখাটো চরিত্রগুলিকেও নিজের অভিনয় গুনে বেশ মজাদার করে তুলতেন দর্শকদের কাছে। তবে শেষ জীবনে কেউ খোঁজ রাখেনি এই অভিনেতার। নিজের সারাটা জীবন ধরে যেই মানুষটা দর্শকদের নিজের প্রতিভা দিয়ে আনন্দ দিয়ে গিয়েছে শেষকালে এসে অবহেলা ছাড়া আর কিছুই পাননি তাদের থেকে।

অভিনেতা ও পরিচালক উৎপল দত্তের নাট্যদলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন সুনীল মুখোপাধ্যায়। পরে পরিচালক মৃণাল সেনের কলকাতা ৭১ ছবিতে প্রথম কাজ করেন। কিন্তু এই ছবিতে তার অভিনয়ের জায়গাটি সম্পাদনায় বাদ যায়। পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের নিম অন্নপূর্ণা ছবিতে তিনি মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করে পরিচিতি পান। মূলত চাকর, মাতাল, চোর ইত্যাদি প্রান্তিক চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি। ঋতুপর্ন ঘোষের প্রথম সিনেমা হীরের আংটিতে চোরের ভূমিকায় অভিনয় করেন। অজস্র বাংলা ছবি ও টেলিভিশন সিরিয়াল ও মঞ্চে তিনি সহ অভিনেতার কাজ করেছেন৷

 ৯০ দশকে মনোজদের অদ্ভুত বাড়ী বাংলা টেলিসিরিজে তিনি গোয়েন্দা বরদাচরণের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, খারিজ, পার, আবার অরণ্যে, কালবেলা, মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার, পদ্মানদীর মাঝি, তাহাদের কথা, বোস, দ্য ফরগটেন হিরো ইত্যাদি সিনেমার পাশাপাশি মূল ধারার বাণিজ্যিক ছবিতে নিয়মিত অভিনয় করতেন। ক্যালকাটা পিপলস আর্ট থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সুনীল মুখোপাধ্যায়। ফেরা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে বেস্ট সাপোর্টিং রোলের পুরস্কার পান তিনি।

শেষকালে অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন অভিনেতা সুনীল মুখার্জী। সকাল সন্ধ্যা লাগাতার শুটিং চলাকালীন সিঁড়ি থেকে ওঠানামা করার সময় একটি বাচ্চা মেয়েকে কোল থেকে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি যার পর প্রোডাকশন হাউজের সঙ্গে বেশ ঝামেলা হয় তার। সেই ঝামেলা সামাল দিয়েছিলেন অভিনেত্রী সংঘমিত্রা ব্যানার্জি। আসলে ওই রোগা মানুষটার শরীরের শক্তি বলতে আর কিছুই ছিল না।

শেষকালে তিনি অভিনয় করা কমিয়ে দিয়েছিলেন কারণ ওই একই চরিত্রে অভিনয় করতে তার আর ভালো লাগতো না। তিনি বলেন চোর গুন্ডা ভিখারি চাকর দরিদ্র এই সমস্ত চরিত্রের অভিনয় মানুষকে তিনি অনেক দিয়েছেন। আর তার দেওয়ার কিছু নেই। এত বড় বড় মানুষের সঙ্গে কাজ করার পরেও আর্থিকভাবে সচ্ছলতা কখনোই তার জীবনে আসেনি। তাই নিজের সমগ্র জীবন স্ত্রী আর সন্তানকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতেই কাটিয়ে দেন তিনি। শেষ কলে তার দেহে টিবি রোগ ধরা পড়ে। জীবনের অন্তিমে চরম অর্থাভাবে রোগব্যাধি জর্জরিত অবস্থায় ২০১২ সালের মে মাসে মারা যান তিনি। মারা যাওয়ার আগে এই মানুষটি দর্শকদের জন্য রেখে গিয়েছেন মনে রাখার মতো কিছু কাজ। এক কাদেরী জনপ্রিয় অভিনেতা পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও তার মায়া ত্যাগ করা দর্শকদের সাধ্য নয়।

Back to top button