‘বামপন্থী হয়েও তৃণমূলের কাজ করেছি!’ টলিউড টেকনিশিয়ানদের ব্যবহার করছে কর্পোরেট এজেন্সি? কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্ফোরক অভিনেতা অরিত্র দত্ত বণিক!

বর্তমান সময়ের অন্যতম পরিচিত মুখ এবং এক সময়ের জনপ্রিয় শিশুশিল্পী অরিত্র দত্ত বণিক (Aritra Dutta Banik) সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে টলিউড এবং রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেছেন। অরিত্র কেবল একজন অভিনেতাই নন, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি টলিউড ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের সাথে যুক্ত এবং বর্তমানে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের নেপথ্যেও কাজ করছেন। তাঁর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের পেশাদারিত্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে এক স্বচ্ছ ধারণা দিয়েছে। বিশেষ করে টলিউডের কর্পোরেট পরিকাঠামো এবং সেখানে রাজনীতির অনুপ্রবেশ কীভাবে কাজের ধরণকে বদলে দিচ্ছে, তা নিয়ে অরিত্রর পর্যবেক্ষণ সাধারণ দর্শকদের পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রির মানুষদেরও ভাবিয়ে তুলেছে।

আলোচনার মূল কেন্দ্রে ছিল টলিউডের বিখ্যাত প্রযোজনা সংস্থা এবং তাদের প্রভাব। অরিত্র উদাহরণ হিসেবে শ্রীকান্ত মোহতা এবং তাঁর সংস্থা ‘এসভিএফ’ (SVF)-এর প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ব্যক্তিগত আইনি জটিলতা বা কর্ণধারের গ্রেফতারি সত্ত্বেও একটি শক্তিশালী কর্পোরেট সংস্থা কীভাবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে। এসভিএফ-এর কর্ণধার গ্রেফতার হওয়ার পরেও সেই প্রোডাকশন হাউস বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং তারা একের পর এক বড় বাজেটের সিনেমা এবং জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজ তৈরি করে চলেছে। এই উদাহরণটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ব্যক্তি বিশেষের অনুপস্থিতিতেও একটি সুগঠিত ‘সিস্টেম’ বা ইন্ডাস্ট্রি কীভাবে নিজের কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

টলিউড এবং আইপ্যাকের (I-PAC) মধ্যেকার পেশাদার সম্পর্ক নিয়েও এক নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে এই আলোচনায়। অরিত্র জানান, আইপ্যাক যখন তৃণমূলের বিভিন্ন প্রচারমূলক কাজের দায়িত্ব নেয়, তখন তারা টলিউডের একঝাঁক দক্ষ চলচ্চিত্র নির্মাতাকে হায়ার করেছিল। মজার বিষয় হলো, এই টিমে কাজ করা সকল কলাকুশলীই যে শাসক দলের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এমনটা নয়। সেখানে অনেক কট্টর বামপন্থী বা ভিন্ন মতাদর্শের পরিচালক ও টেকনিশিয়ানরাও স্রেফ পেশাদারিত্বের খাতিরে কাজ করেছেন। এটি টলিউড ইন্ডাস্ট্রির একটি অনন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্ধ্বে উঠে পেশাদার কাজকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি ঐতিহ্য বজায় রয়েছে।

তবে এই প্রফেশনালিজমের আড়ালে রাজনীতির গভীর অনুপ্রবেশ নিয়ে অরিত্র বেশ কিছু নেতিবাচক দিকও তুলে ধরেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক সংস্থাগুলি টলিউডের কাজের ধরণকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। প্রচারমূলক ভিডিও বা ফিল্ম নির্মাণের ক্ষেত্রে সৃজনশীল স্বাধীনতার চেয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। তাঁর মতে, আগে টলিউড নিজস্ব গতিতে চলত, কিন্তু এখন কর্পোরেট এবং রাজনৈতিক এজেন্সিগুলোর হস্তক্ষেপের ফলে সেই স্বাধীনতায় কিছুটা কোপ পড়েছে। বিশেষ করে বড় মাপের ক্যাম্পেইনগুলোতে ইন্ডাস্ট্রির প্রতিভাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার একটি সুশৃঙ্খল পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ মাধ্যমিকে দুর্দান্ত ফল সারেগামাপা খ্যাত আরাত্রিকার! গান আর পড়াশোনা দুই সামলে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করলেন ছোট্ট কমরেড!

পরিশেষে, অরিত্রর এই বিশ্লেষণ টলিউড এবং ক্ষমতার অলিন্দের মধ্যকার এক জটিল রসায়নকে জনসমক্ষে এনেছে। তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন কীভাবে টলিউডের মেধা এবং শ্রমকে রাজনীতির ময়দানে বাণিজ্যিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আলোচনার শেষে এটি পরিষ্কার যে, বাংলা চলচ্চিত্র জগত এবং তার সাথে যুক্ত মানুষেরা একদিকে যেমন সৃজনশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে তেমনি রাজনীতির আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা পরিকাঠামোর চাপে পিষ্ট হচ্ছেন। টলিউডের এই ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল’ রূপান্তর এবং সেখানে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে অরিত্রর এই বিস্ফোরক তথ্য আগামী দিনে টলিউড মহলে নিশ্চিতভাবেই বিতর্কের জন্ম দেবে।

Back to top button