‘ওর সাথে অন্যায় হয়েছে…মেট্রো স্টেশনে একাই লড়েছি গুন্ডাদের সাথে!’ পুলিশের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে কালজয়ী ‘দহন’-এর নেপথ্যে থাকা আসল নায়িকা অনন্যা চক্রবর্তী! জেনে নিন তার লড়াইয়ের গল্প!

নব্বইয়ের দশকের কলকাতায় রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে এক তরুণীকে নিগ্রহের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এক সাহসী নারী। পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষ সেই সত্য ঘটনা অবলম্বনেই তৈরি করেছিলেন কালজয়ী সিনেমা দহন। পর্দার সেই প্রতিবাদী চরিত্র ঝিনুক-এর বাস্তব রূপকার ছিলেন সাংবাদিক অনন্যা চক্রবর্তী (Ananya Chakraborti)। সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনের সেই হাড়হিম করা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কর্মজীবনের নানা বিতর্কিত ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে মুখ খুলেছেন, যা বর্তমান সমাজব্যবস্থার দিকে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।
সেই ঐতিহাসিক রাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনন্যা জানান, প্রতিবাদ করার পর তাকে ও তার পরিবারকে যে নিদারুণ মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল, তা ছিল অকল্পনীয়। তিনি অভিযোগ করেন যে, সেই সময় পুলিশ এবং বিচারব্যবস্থা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল যাতে তারা কোনোদিন আদালতের সমন না পান বা বিচার প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যান। এমনকি তার পরিবারও সেই সময় এই আইনি জটিলতা থেকে তাকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চেয়ে একজন প্রতিবাদী নারীকে দমানোর চেষ্টাই যেন সমাজ ও প্রশাসনের কাছে তখন বেশি জরুরি ছিল।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী হিসেবে অনন্যা চক্রবর্তীর আবেগ অত্যন্ত গভীর। তিনি তার জীবনের সবথেকে মূল্যবান দুটি বছর সেখানে কাটিয়েছেন বলে জানান। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাগিং বিতর্ক এবং সাম্প্রতিক ছাত্র মৃত্যুর ঘটনায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত। তিনি অত্যন্ত সাহসের সাথে দাবি করেন যে, তার সময়ে যদি এমন কোনো র্যাগিংয়ের ঘটনা ঘটত বা তার কোনো সহপাঠীর সাথে এমন অন্যায় হতো, তবে আর কেউ না দাঁড়ালেও তিনি একাই রুখে দাঁড়াতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে এই অরাজকতা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা নিয়ে তার বক্তব্য বর্তমান ছাত্র রাজনীতির প্রেক্ষাপটে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
সাংবাদিকতা এবং পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন হিসেবে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সমাজের অন্ধকারতম দিকগুলো দেখেছেন। পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েদের উদ্ধার করতে গিয়ে তিনি এক ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হন। তিনি জানান, অনেক নারী ঘরোয়া হিংসা সহ্য করতে না পেরে লালবাতি এলাকায় আশ্রয় নেন। তাদের কাছে বাড়ির মারধরের চেয়ে সেই অন্ধকার জগতের জীবন ভালো মনে হয় কারণ সেখানে অন্তত দু’বেলা খাবার পাওয়া যায়। সমাজের এই চরম দারিদ্র্য এবং নারীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে তুলে ধরেন।
আরও পড়ুনঃ ‘মহিলা রয়েছে এমন পোস্টারের ওপর এরা এসব ছড়িয়ে দেয়…’ ‘অনেক সময় বুকের অংশটা ছিঁড়ে নেয়, এরা মানুষ?’ রাস্তায় আপত্তিকর দৃশ্য দেখে বিস্ফো’রক জিতু কামাল!
নারী স্বাধীনতা এবং রাত দখলের লড়াই নিয়ে তার মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রাত ১১টার পর নারীদের বাইরে বের হওয়া নিয়ে প্রশাসনের কোনো কোনো মহলের আপত্তির কড়া সমালোচনা করেন তিনি। অনন্যা স্পষ্ট জানান, তিনি বিশ্বাস করেন না যে মেয়েদের জন্য রাতে বের হওয়া নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পুরনো মন্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি বলেন, নেত্রী নিজে যদি রাতে বাইরে বের হতে পারেন, তবে অন্য নারীদের ক্ষেত্রে বাধা কেন? তার মতে, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের, তাদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা নয়। সাহসিকতা এবং আপসহীন লড়াইয়ের এই বার্তা দিয়েই তিনি আজকের প্রজন্মের নারীদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়েছেন।

