‘স্বামীর অগাধ টাকা থাকা সত্ত্বেও…’ ‘বিয়ের পর থিয়েটারে ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা’ ‘সংসারের দায়িত্ব সামলে করেছেন অভিনয়…’ আজ নিজের যোগ্যতায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে কৌশিকী গুহ!

বর্তমানে টলিউডের (Tollywood) অতি পরিচিত এবং জনপ্রিয় মুখ কৌশিকী গুহ (Kaushiki Guha)। ছোটপর্দার দর্শকদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় একজন অভিনেত্রী। তবে আজকের এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ লড়াই এবং কঠোর পরিশ্রমের ইতিহাস। অভিনয়কে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে তাঁর জীবন এক সম্পূর্ণ অন্য খাতে বয়েছিল। প্রবল সামাজিক বাধা, পারিবারিক আপত্তি এবং সংসারের দায়িত্ব সামলেও নিজের ইচ্ছাশক্তিকে কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, কৌশিকী গুহর জীবন তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

১৯৯০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে আশুতোষ কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই কৌশিকী দেবীর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ প্রথম বাস্তবে রূপ নেওয়ার সুযোগ পায়। কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি পাড়ার একটি নাট্যদল থেকে তিনি অভিনয়ের প্রস্তাব পান এবং মঞ্চে অভিনয় শুরু করেন। তবে আর পাঁচটা সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো তাঁর পরিবারেও গ্রুপ থিয়েটার নিয়ে প্রবল আপত্তি ছিল। ফলে পাড়ার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার স্বাধীনতা থাকলেও, নিয়মিত থিয়েটার করার অনুমতি তিনি পাননি। এর মধ্যেই কলেজের পার্ট ওয়ান পরীক্ষা শেষ হতেই অনুপম গুহর সাথে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়।

বিয়ের পর নতুন সংসারে গিয়ে শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক নতুন লড়াই। শ্বশুরবাড়িতে গান বা আবৃত্তি করার মতো সংস্কৃতি চর্চায় উৎসাহ দেওয়া হলেও, নাটক বা থিয়েটার করার ক্ষেত্রে সামাজিক ও পারিবারিক বাধা ছিল অনড়। তবুও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে তিনি হাল ছাড়েননি, বছরে অন্তত একটি নাটকে অংশ নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। তবে একদিকে সংসারের দায়িত্ব আর অন্যদিকে অভিনয়ের সুযোগ না পাওয়া এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে অন্যভাবে স্বাবলম্বী করার সিদ্ধান্ত নেন।

ছোটবেলায় মায়ের দেওয়া একটি শিক্ষা কৌশিকী দেবীর মনে গভীরভাবে গেঁথেছিল পরিবারের পুরুষেরা যতই উপার্জন করুক না কেন, প্রত্যেক নারীর নিজের পায়ে দাঁড়ানো উচিত। মায়ের এই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি ব্যবসার জগতে পা রাখেন। একে একে সাইবার ক্যাফে, কম্পিউটার সেন্টার এবং রেস্টুরেন্টের ব্যবসা শুরু করে তিনি দারুণ সাফল্য লাভ করেন। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে প্রথমে দু-চাকা এবং পরবর্তীতে চার-চাকা গাড়ি কিনে তিনি প্রমাণ করে দেন যে নারীরা চাইলে সব পারে। স্বামী সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও নিজের উপার্জনে বাঁচার আনন্দই ছিল তাঁর কাছে আলাদা।

আরও পড়ুনঃ ‘আলাদা করে নিজের সন্তানের আর অনুভূতিটাই নেই!’ ‘ওকে মানুষ করতে গিয়েই আমার মাতৃত্ব…!’ ‘আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে একটাই…’ বিদায় নেওয়ার আগে কোন স্বপ্ন পূরণ করতে চান অভিনেত্রী? জানালেন অনন্যা সেনগুপ্ত?

ব্যবসায় সফল হলেও মনের গভীরে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তাঁর বিন্দুমাত্র কমেনি। অবশেষে ২০১৫ সালে তাঁর জীবনে বড় সুযোগ আসে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘চোখের বালি’-তে অভিনয়ের মাধ্যমে। সেই সময় তাঁর মেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী এবং ছেলে অনেকটাই বড় হয়ে গিয়েছে। মায়ের স্বপ্নের কথা জেনে ছেলেমেয়েরাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দেয় এবং সংসারের দায়িত্ব নিজেরা ভাগ করে নেওয়ার আশ্বাস দেয়। ছেলেমেয়েদের সেই নিঃস্বার্থ সাপোর্টের ওপর ভর করেই কৌশিকী গুহ নতুন করে অভিনয় জগতে পথ চলা শুরু করেন এবং আজ তিনি একজন সফল ও প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রী হিসেবে সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।

Back to top button