‘স্বামীর কাছে স্যানিটারি ন্যা’পকিন, অ’ন্তর্বাসের টাকা চাইব? লজ্জা লাগে…’ ‘বিয়ের পর জীবনটা মোটেই সুখের ছিল না!’ জীবন থেকে জীবনাদর্শ! অকপটে গাইনোকোলজিস্ট তথা অভিনেত্রী দীপান্নিতা হাজারী!

মেডিকেল প্রফেশনাল, কলামিস্ট, সমাজসেবী এবং জনপ্রিয় অভিনেত্রী একই অঙ্গে এত রূপ সচরাচর দেখা যায় না। কিন্তু এই সবকটি ক্ষেত্রেই যিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, তিনি ডক্টর দীপান্নিতা হাজারী (Dipannita Hazari)। দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকা এই চিকিৎসক শুধু প্রেসক্রিপশন লিখেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং তাঁর সাবলীল অভিনয় এবং মার্জিত ব্যক্তিত্ব দিয়ে জয় করেছেন আপামোর বাঙালি দর্শকের মন। সম্প্রতি একটি বিশেষ পডকাস্টে মুখোমুখি হয়ে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর জীবনের প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ ও বর্ণিল অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর শৈশবের জেদ, ডাক্তারি জীবনের লড়াই থেকে শুরু করে সমাজসেবা ও গ্ল্যামার জগতের পিছনের না-বলা গল্পগুলো নিয়েই সেজে উঠেছে এই বিশেষ প্রতিবেদন।

চিকিৎসা পেশায় ডক্টর হাজারীর পথ চলাটা একেবারেই সহজ ছিল না, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন নারীদের জন্য পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। ১৯৭৯ সালে এমবিবিএস পাস করা দীপান্নিতা দেবী ছিলেন হায়ার সেকেন্ডারির নম্বরের ভিত্তিতে সরাসরি মেডিকেল কলেজে সুযোগ পাওয়া শেষ ব্যাচের একজন, যেখানে মাত্র ৬০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থী কলকাতার চারটি সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেতেন। সচ্ছল বাঙালি পরিবারের একমাত্র প্যাম্পারড কন্যা হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর পরিবারে চিকিৎসকদের আধিক্য থাকা সত্ত্বেও, বাবা তাঁর ডাক্তারি পড়ার সিদ্ধান্তে একেবারেই খুশি ছিলেন না। কিন্তু অদম্য জেদ নিয়ে তিনি আরজিকর মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। পড়াশোনার দ্বিতীয় বর্ষেই মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়, যা ছিল সেই সময়ের সামাজিক নিয়ম। বিয়ের পর এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও, তাঁর আই সার্জন স্বামী এবং পরিবারের ক্রমাগত সহযোগিতা ও পাশে থাকার ফলেই তিনি তাঁর পড়াশোনা ও দীর্ঘ চিকিৎসা ক্যারিয়ার অত্যন্ত সফলভাবে শেষ করতে পেরেছিলেন।

চিকিৎসার পাশাপাশি ডক্টর দীপান্নিতা হাজারী সমাজের এক বিশাল অংশের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, যার মধ্যে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের বিষয়টি তাঁর কাছে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পায়। পডকাস্টে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি জানান, নারীদের আর্থিক স্বাধীনতা কতটা জরুরি, কারণ নিজের একটি স্যানিটারি ন্যাপকিন বা অন্তর্বাস কেনার জন্যও স্বামীর কাছে টাকা চাওয়াটা তাঁর কাছে ভীষণ লজ্জাজনক মনে হতো। সবাইকে বড় চাকরি করতে হবে এমন নয়, বরং ঘরে বসে ছোটখাটো টিউশনি, সেলাই, গান বা আবৃত্তি শিখিয়েও যে নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব, সেই বার্তা তিনি দিয়েছেন। এই ভাবনা থেকেই তিনি শুরু করেন তাঁর নিজস্ব বুটিক ও ওয়ার্কশপ ‘সন্ধ্যা রাগ’, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মেয়েদের এমব্রয়ডারি ও হস্তশিল্পের কাজ শিখিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা হয়। এছাড়া, ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার কলকাতা শাখার দীর্ঘ ১৬ বছরের সভাপতি হিসেবে এবং সোনাগাছির যৌনকর্মীদের অধিকার রক্ষাকারী এনজিও ‘দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটি’-র একজন পরম হিতৈষী ও উপদেষ্টা হিসেবে তিনি বছরের পর বছর ধরে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

আজকের একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে যখন দীপান্নিতা দেবী তাঁর ফেলে আসা ২১ বছর বয়সের দিনগুলির দিকে তাকান, তখন তাঁর মনে কোনো আক্ষেপ কাজ করে না, বরং তিনি বর্তমান জীবনটাকেই অনেক বেশি সুন্দর মনে করেন। অনেকেই শৈশব বা কৈশোরের দিনগুলোকে জীবনের সেরা সময় বললেও, তাঁর মতে সেই সময় সামাজিক বাধা, আর্থিক চিন্তা, ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠার চাপ এবং প্রতিনিয়ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার এক মানসিক ধকল থাকে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তিনি মনে করেন, তিনি যা যা করতে চেয়েছিলেন, তার প্রায় সবটুকুই সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন। বর্তমানের এই ৭১ বছর বয়সে এসে তাঁর মন অনেক বেশি শান্ত, স্থির এবং চিত্ত চাঞ্চল্যহীন, যা তাঁকে যেকোনো কাজ অনেক বেশি গুছিয়ে এবং শান্তিপূর্ণভাবে করার সুযোগ করে দেয়। বর্তমান যুগের নারীরা যে নিজেদের ক্যারিয়ার এবং ইচ্ছা পূরণের জন্য অনেক বেশি সামাজিক সহযোগিতা ও সুযোগ পাচ্ছেন, সেই ইতিবাচক পরিবর্তনকেও তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ রাজুর আসল নাম জানতেই উড়ল সম্রাটের ঘুম! সম্রাট ও রাজুর মধ্যে লুকিয়ে কোন গোপন সংযোগ? প্রশ্নের মুখে সম্রাটের মিথ্যে অজুহাত, কোন গোপন সত্যি আড়াল করছে সে?

চিকিৎসকের স্টেথোস্কোপ থেকে শুরু করে সমাজসেবার আঙিনা, কিংবা লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের গ্ল্যামার জগৎ ডক্টর দীপান্নিতা হাজারীর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই নতুন প্রজন্মের নারীদের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। জীবনের প্রতিটি স্তরে কীভাবে বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে নিজের বহুমুখী প্রতিভাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় এবং একই সঙ্গে সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। কর্মব্যস্ত জীবন এবং বয়সের সংখ্যাকে স্রেফ একটি সংখ্যায় পরিণত করে আজীবন সৃজনশীল কাজের মধ্যে ডুবে থাকার যে অদম্য ইচ্ছা তিনি দেখিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। ডক্টর হাজারীর এই বর্ণিল জীবন-কাহিনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মনের জোর এবং কাজের প্রতি ডেডিকেশন থাকলে যেকোনো বয়সেই জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উদযাপন করা সম্ভব এবং নিজের একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলা সম্ভব।

Back to top button