‘অন্যের করা অন্যায়ের দায় আমার গায়েও লাগছে!’ ‘মাঝে মাঝে সিনেমা করা বিলাসিতা মনে হয়…’ টলিউডের কোন্দল ও সমাজ নিয়ে সরব অভিনেতা কৌশিক সেন!

বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের অন্যতম শক্তিশালী এবং বুদ্ধিদীপ্ত অভিনেতা হিসেবে কৌশিক সেন (Koushik Sen) নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কেবল অভিনয়ের গুণেই নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে নির্ভীক মতপ্রকাশের জন্যও তিনি দর্শক মহলে সমাদৃত। দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিনয় জীবনে ধ্রুপদী নাটক থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বা শৈল্পিক সিনেমা সব মাধ্যমেই তিনি সাবলীল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি একাধারে একজন পথপ্রদর্শক এবং প্রখর চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি তাঁর আসন্ন কাজ এবং সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি পুনরায় প্রমাণ করলেন যে, একজন শিল্পী হিসেবে সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ঠিক কতটা গভীর।
বর্তমান সমাজ ও রাজনীতির উত্তাল পরিস্থিতি নিয়ে কৌশিক সেন অত্যন্ত গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, কোনো মানুষ বা শিল্পী আজ একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা নন। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গালফ যুদ্ধের মতো ঘটনাও সাধারণ মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। তাঁর মতে, সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নিম্নমানের রাজনীতির কারণেই আজ সর্বত্র এই টালমাটাল অবস্থা। তিনি মনে করেন, অন্যের করা অন্যায়ের দায়ভার অনেক সময় নিরপরাধ মানুষের গায়েও এসে লাগে। এই অসহিষ্ণুতার মূলে তিনি মূলত অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন, যেখানে দেশের এক ক্ষুদ্র অংশের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ কুক্ষিগত হয়ে আছে।
ব্যক্তিগত মতাদর্শ এবং ট্রোলিং নিয়েও অভিনেতা তাঁর দৃঢ় অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁকে ‘চটিচাটা’ বা নির্দিষ্ট দলের তকমা শুনতে হয়েছে। কৌশিকবাবু জানান, মানুষ যখন কাউকে মানুষ হিসেবে না ভেবে যন্ত্রের মতো নির্দিষ্ট কোনো ‘বক্সে’ ফেলে দেয়, তখনই এ ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। অপর্ণা সেন থেকে শুরু করে শঙ্খ ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বদেরও যে ধরনের অপমানের সম্মুখীন হতে হয়েছে, তাকে তিনি ‘সময়ের দোষ’ এবং ‘মানসিক অবক্ষয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি যে নিজের আদর্শে অবিচল থাকবেন এবং যা বিশ্বাস করেন তা-ই বলবেন, তা অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে ব্যক্ত করেছেন।
আরও পড়ুন: কাঞ্চন-শ্রীময়ীর সংসারে নতুন অতিথি? আবারও মা হতে চলেছেন শ্রীময়ী? অবশেষে মুখ খুললেন অভিনেত্রী শ্রীময়ী চট্টরাজ!
বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের বর্তমান সঙ্কটজনক অবস্থা নিয়ে অভিনেতা এক জরুরি দিক নির্দেশ করেছেন। টলিউডে ছবি রিলিজের তারিখ নিয়ে প্রযোজকদের মধ্যে যে কামড়াকামড়ি চলে, তা নিয়ে তিনি বিরক্ত। তাঁর মতে, ছবি ব্যবসা করবে কি না সেই আলোচনার পাশাপাশি ‘এস্থেটিক্স’ বা শৈল্পিক মান নিয়ে আলোচনা হওয়াটা অনেক বেশি জরুরি। টলিউডে প্রতিভাবান শিল্পী ও পরিচালকের অভাব না থাকলেও সম্মিলিত প্রচেষ্টার বা ‘কোলাবরেটিভ ওয়ার্ক’-এর অভাবে ইন্ডাস্ট্রি ধুঁকছে। কেবল উৎসবের মরসুমে স্ক্রিন দখলের লড়াই না করে ভালো চিত্রনাট্য এবং নতুন ধরনের গল্পের ওপর জোর দেওয়ার জন্য তিনি ইন্ডাস্ট্রির সংশ্লিষ্ট মহলে আহ্বান জানিয়েছেন।
সবশেষে, নিজের জীবনদর্শন এবং ছেলে ঋদ্ধি সেনের প্রসঙ্গে অভিনেতা এক গভীর উপলব্ধির কথা শুনিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন জীবনের কোনো কিছুই চরম না বরং বৈপরীত্যই জীবনের ধ্রুব সত্য। ঋদ্ধি সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, শিল্পীর পরিবারে বড় হওয়া এবং সঠিক আদর্শের চর্চা করা কতটা জরুরি। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অভিনয়কে কেবল বিলাসিতা হিসেবে না দেখে একে প্রতিবাদের হাতিয়ার এবং সমাজকে চেনার মাধ্যম হিসেবে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর আসন্ন ওয়েব সিরিজ ‘কুহেলি’-তে একজন ঘোরতর নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করাও তাঁর এই পরীক্ষামূলক জীবনদর্শনেরই একটি অংশ, যা আগামী ১৫ই মে থেকে দর্শকরা হইচই প্ল্যাটফর্মে দেখতে পাবেন।

