নায়িকা আবার মোটা হয় নাকি, পর্দায় সোহিনীকে দেখে বমি পাচ্ছিল! ‘ইচ্ছে’ ছবির সময় কী কী শুনেছিলেন নিজেই জানালেন পরিচালক

শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় বর্তমানে টলিউডের দুই জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠিত পরিচালক। এই দুই পরিচালকদ্বয়ের প্রথম পরিচালিত ছবির নাম ‘ইচ্ছে’। ২০১১ সালের ১৫ জুলাই প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। অভিনয় করেছিলেন সোহিনী সেনগুপ্ত, ব্রাত্য বসু, সমদর্শী দত্ত, বিদিতা বাগ। ছবি মুক্তির পর কেটে গিয়েছে একটি দশক। কিন্তু আজও দর্শকের মনে আলাদা একটা জায়গা করে নিয়েছে ছবিটি। নন্দিতা-শিবপ্রসাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি এই ছবি। ছবিটি নিবেদন করেছিলেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত।
সাহিত্যিক সুচিত্রা ভট্টাচার্যর উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছিল ছবির চিত্রনাট্য। মা ও ছেলের সম্পর্কের কথা বলেছিল ‘ইচ্ছে’। মায়ের চরিত্রে সোহিনী সেনগুপ্তর পারফরম্যান্স যেন ভোলার নয়। তেমনই ভাল অভিনয় করেছিলেন সমদর্শী। জোড়ালো স্টারকাস্ট ছাড়া কমবাজেটের একটি বাংলা ছবি দর্শকের মনে দাগ কেটেছিল সেই সময়। প্রথম ছবিতেই প্রমাণ করেছিলেন কন্টেন্টই আসল। প্রথম ছবিতেই পরিচালক হিসেবে নিজেদের জায়গা পাকা করেছিলেন নন্দিতা-শিবপ্রসাদ। ‘ইচ্ছে’ দিয়ে শুরু। সেই জার্নির পর আরও ভাল ভাল ছবি দর্শকদের উপহার দিয়ে তাদের ইচ্ছেপূরণ করে চলেছেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়।
গল্পটা মাথায় আসা মাত্রই নায়িকার লুকটা ঠিক কেমন হবে তার একটা ছক কষে ফেলেছিলেন শিবপ্রসাদ। মায়ের চরিত্রে অভিনয় করবেন নায়িকা। এমন একজন মা যে নিজের সন্তানের পেছনে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে। নিজের প্রতি একটা বিন্দুও নজর দেননি কখনো। তিনি তার চলতি পথে একটি মা ছেলেকে ঠিক যেমনভাবে দেখেছিলেন সিনেমার পর্দাতেও ঠিক তেমনটাই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন পরিচালক। অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন নায়িকা কি হতে হবে সবসময় সুন্দরী। একজন পরিচালক তো বলেই দিয়েছিলেন নায়িকা হবে গ্ল্যামারেস, মোটা নায়িকা আবার হয় নাকি! কিন্তু তিনি যেটা ভেবেছিলেন যেটা কল্পনা করেছিলেন ঠিক তেমনটাই রুপায়নও করেছিলেন বাস্তবে। মা হিসেবে সোহিনির অভিনয় সেই সময় সারা ফেলে দিয়েছিল দর্শকমহলে।
পরিচালক শিবপ্রসাদ জানান ‘ইচ্ছে’ মুক্তি পাওয়ার ঠিক আগে এই ইন্ডাস্ট্রির নামডাকওয়ালা প্রযোজক-পরিবেশকদের জন্য একটি ক্লোজড-ডোর শো-এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল সল্টলেকের তৎকালীন এক ল্যাবে। সেখানে সিনেমার প্রথম শো চলছে আর তারা উদগ্রীব হয়ে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। সিনেমা শেষ হল, এক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রযোজক হল থেকে প্রথম বেরোতেই তাঁর কাছে গিয়েছিলেন শিবপ্রসাদ অনেক আশা নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘‘শেষ করে দিলেন সিনেমাটা, এই মেয়েটাকে কেউ হিরোইন নেয়? জঘন্য লাগছিল, বমি আসছিল ওকে দেখে আমার। পুরো পর্দা জুড়েই তো ও, কী করলেন আপনি! এত ভাল গল্পটা মার্ডার করে দিলেন! আমার ঘেন্না করছিল এই ছবিটা দেখতে। মার্ডার করে দিলেন এই সিনেমাটার।’’ জীবনের প্রথম সিনেমার, প্রথম দর্শকের প্রথম অভিব্যক্তি সারা জীবন মনে রাখবেন শিবপ্রসাদ।
তবে ‘ইচ্ছে’ মুক্তি পাওয়ার পর, সব শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে ১২৫ দিন পার করেছিল এবং প্রচুর ভালোবাসা কুড়িয়েছিল। যে প্রযোজক বলেছিলেন যে, সিনেমাটা দেখতে তাঁর বমি পাচ্ছে, তিনি তাঁর পরের তিনটি সিনেমা করতে দিতে চেয়েছিলেন তাকে। আর যে প্রযোজক বলেছিলেন যে মোটা হিরোইন চলে না, গ্ল্যামারাস হিরোইন চলে, তিনি আজও আক্ষেপ করে যান, ‘ইচ্ছে’ না করার জন্য। আর যে পরিবেশক বলেছিলেন পোস্টারের গ্ল্যামার চাই, মোটা হিরোইন চলে না, তিনি ‘ইচ্ছে’-র ১০০ দিনের পার্টিতে এসেছিলেন আর পরিচালকের হাত ধরে বলেছিলেন, ‘‘আপনার হিরোইনই কিন্তু এই ছবির জান। আপনি ঠিক, আমি ভুল। আমার ছবির চিনতে ভুল হয়ে গিয়েছিল। কী অভিনয়টাই করেছে বলুন তো! আমার বৌ বলেছে যে, আমি নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলাম।’’

