‘উনি বেঁচে থাকলে হয়তো কথাটা বলতাম না, আজ উনি নেই বলেই…’ ‘সব কথা, সব সম্পর্ক বাজারে আনা যায় না!’ দীর্ঘ ১৩ বছর উত্তম কুমারের থেকে কী গোপন করেছিলেন মৃণাল মুখার্জি? মহানায়কের জীবনাবস্থায় কেন কাউকে কিছু বলেননি অভিনেতা?

বাংলা বিনোদন জগতের এক অনন্য ও প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন প্রয়াত অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী মৃণাল মুখোপাধ্যায় (Mrinal Mukherjee)। তিনি তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বহু বৈচিত্র্যময় চরিত্রে রূপদান করেছেন, কিন্তু পর্দার আড়ালে বজায় রেখেছিলেন এক বিরল আত্মসম্মান ও স্বকীয়তা। প্রয়াণের বহু আগেই এক অনবদ্য ভিডিও সাক্ষাৎকারে তিনি ভাগ করে নিয়েছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর জীবনের এক অজানা অধ্যায়ের কথা। জীবনের সায়াহ্নে এসে মহানায়কের সঙ্গে নিজের যাপনের এমন এক রূপ তিনি প্রকাশ করেছিলেন, যা সচরাচর বিনোদন জগতে দেখা যায় না।

ইন্ডাস্ট্রিতে যখন মহানায়কের সান্নিধ্য বা ঘনিষ্ঠতা ভাঙিয়ে কাজ পাওয়ার প্রতিযোগিতা তুঙ্গে, তখন এই প্রবীণ শিল্পী বিশ্বাস করতেন সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিতে। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, জীবনের সব সম্পর্ককে বাজারে এনে নাম কুড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই; কিছু সম্পর্ককে প্রচারের বাইরে আড়ালে রাখাটাই শ্রেয়। খোদ উত্তম কুমারের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নিজের যোগসূত্র প্রকাশ করে কাজ পাওয়ার পথ সহজ করাকে তিনি নিজের ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতার অপমান বলে মনে করতেন।

সেই পুরোনো সাক্ষাৎকারে তিনি এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করতে গিয়ে জানান, ১৯৬৪ সাল থেকেই মহানায়কের সঙ্গে তাঁর গভীর পরিচয় ও যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। মাঝে ছয় বছরের বিরতি থাকলেও পরবর্তী সময়ে আবার তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছর একসূত্রে বাঁধা থেকেও এবং প্রতিনিয়ত মহানায়কের সংস্পর্শে এসেও মৃণাল মুখোপাধ্যায় একটি পরম সত্য মহানায়কের কাছে পুরোপুরি আড়াল করে রেখেছিলেন। মহানায়ক নিজেও বিন্দুমাত্র টের পাননি যে, মৃণালবাবুর এই গোপন রাখার পেছনে ঠিক কী মূল সমীকরণ লুকিয়ে ছিল! এমনকি মহানায়ক বেঁচে থাকাকালীনও তাদের মধ্যেকার এই কথা গোপন রাখতে হয়েছিল অভিনেতাকে। উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর একবার এক সাক্ষাৎকারে দুজনের মধ্যেকার সেই কথা প্রকাশ্যে এনেছিলেন মৃণাল মুখোপাধ্যায়।

উত্তম কুমারের কাছে সেই কথা বেশি দিন গোপন রাখতে পারেননি। ১৯৭৭ সালে সেই আড়াল ভেঙে যায় এক অন্য মানুষের হাত ধরে। প্রখ্যাত অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় প্রথম মহানায়ক উত্তম কুমারের কাছে সেই সত্যটি প্রকাশ করেন। সব শোনার পর স্তম্ভিত ও বাক্‌রুদ্ধ মহানায়ক অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি তো আমায় কখনো বলোনি?” মৃণালবাবু স্বকীয় আত্মসম্মান বজায় রেখে সোজা জবাব দিয়েছিলেন, “না ইচ্ছে করেই বলিনি। কেন? আপনার মনে হতে পারে যে আমি ছবিতে কাজ পাওয়ার জন্য এই সম্পর্ক সাজছি।”

আরও পড়ুনঃ চাকরি হারিয়ে এখন অটো চালক শ্রীনিবাস! কমলাকে মিথ্যে বলে শ্রীনিবাসের নতুন লড়াই! সত্যিটা কি জানতে পারবে কমলা? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

আসলে সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের মুখ থেকেই সেদিন উত্তম কুমার প্রথম জানতে পেরেছিলেন যে, তাঁদের পারিবারিক যোগসূত্র এতটাই গভীর ছিল যে রক্ত সম্পর্কের বিচারে মৃণাল মুখোপাধ্যায় ছিলেন খোদ মহানায়কেরই এক কাছের মানুষ! উত্তম কুমারের প্রভাব বা এই রক্তের টানকে কাজে লাগিয়ে কাজ পাওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন মৃণালবাবু, কারণ লোকে যেন তাঁকে মহানায়কের ‘চামচে’ না ভেবে বসে। মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের এই অদম্য স্পর্ধা ও স্পষ্টবাদিতা দেখে সেদিন আপ্লুত ও চমকে গিয়েছিলেন খোদ উত্তম কুমারও। কিছুক্ষণ অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে ভবানীপুরের ভাষায় বলেছিলেন, “তুমি খুব তেটে ছেলে। এ লাইনে খুব কষ্ট পাবে, এই মেজাজ ভালো না।” নিজের নীতিতে অটল থাকা প্রয়াত মৃণাল মুখোপাধ্যায়ের এই অমলিন স্মৃতি আজও বিনোদন জগতে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

Back to top button