‘টলিউডে নেপোটিজম নয়, চলছে চরম ফেভারিটিজম!’ ‘১০-১৫ জনেই সীমাবদ্ধ টলিউড!’ ‘দেড় বছর ধরে শিল্পীদের কাজ বন্ধ থাকে কীভাবে?’ টলিউডের ‘ব্যান কালচার’ নিয়ে সরব দেবযানী চট্টোপাধ্যায়!

বাংলা বিনোদন জগতের অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ দেবযানী চট্টোপাধ্যায় (Debjani Chatterjee )। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছেন। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে অভিনয় জীবনের যাত্রা শুরু করে জয় মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় ছোট পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে একের পর এক হিট ধারাবাহিক এবং ‘সাথীহারা’-র মতো চলচ্চিত্রে নেতিবাচক ও ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে ছোট পর্দা থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে টলিউড ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থা এবং নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে মুখ খুলে বিতর্ক তৈরি করেছেন তিনি।

টলিউডে কাজের পরিবেশ ও সুযোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেবযানী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইন্ডাস্ট্রিতে ‘নেপোটিজম’ বা স্বজনপোষণের চেয়েও মারাত্মক রূপ নিয়েছে ‘ফেভারিটিজম’ এবং ‘গ্রুপিজম’। তাঁর মতে, এখানে নির্দিষ্ট কয়েকজন পরিচালকের নিজস্ব এক-একটি দল রয়েছে। মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন পছন্দের শিল্পীকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সমস্ত প্রজেক্টে নেওয়া হয়। এর ফলে বহু বছর ধরে কাজ করা এবং ইন্ডাস্ট্রির প্রতি নিবেদিতপ্রাণ বহু যোগ্য অভিনেতা-অভিনেত্রী কোনো কারণ ছাড়াই কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও পরিচালকদের এই পছন্দের গোষ্ঠীর বাইরে থাকার কারণে ভালো ভালো কাজ হাতছাড়া হচ্ছে অনেকের।

আরও পড়ুন: ভেঙেছে শরীর, হারিয়েছেন অতি প্রিয় কাল ঘন চুল, কিন্তু হারায়নি আত্মবিশ্বাস! কঠিন সময়েও প্রাণখোলা হাসি! ক্যা’ন্সারের যন্ত্রণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেয়ের ভ্লগে হাসিমুখে ধরা দিলেন অভিনেত্রী এষা ভট্টাচার্য!

ইন্ডাস্ট্রির দ্বিতীয় চরম অন্যায় হিসেবে উঠে এসেছে ‘ব্যান কালচার’ বা শিল্পীদের কাজের সুযোগ আটকে রাখার প্রবণতা। সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানান যে, ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দাপটে একজন শিল্পীকে টানা দেড় থেকে দুই বছর কোনো কাজ করতে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে টেকনিশিয়ান ও ফেডারেশনের সংগঠিত শক্তির সামনে শিল্পীরা কীভাবে অসহায় হয়ে পড়েন, সেই বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। কোনো শিল্পী যদি নিজের কোনো মৌলিক দাবি জানান বা কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তবেই তাঁকে অপ্রত্যক্ষভাবে কাজ থেকে বাদ দিয়ে একঘরে করে ফেলা হয়। একটি সুস্থ ও বিকাশশীল ইন্ডাস্ট্রিতে এই ধরনের ‘ব্যান কালচার’ অত্যন্ত বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

তৃতীয়ত, শিল্পীদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার দায়িত্বে থাকা ‘আর্টিস্ট ফোরাম’-এর ভূমিকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর মতে, গত এক দশকে আর্টিস্ট ফোরাম তার সক্রিয়তা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। সংকটজনক পরিস্থিতিতে ফোরাম শিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। সম্প্রতি রাহুল নামক এক শিল্পীর অকালমৃত্যু এবং শুটিং ফ্লোরে শিল্পীদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নানা অব্যবস্থাপনার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এই ধরনের চরম সংবেদনশীল বিষয়েও ফোরামের ভূমিকা হতাশাজনক। যখনই কোনো শিল্পীকে নিষিদ্ধ বা কাজহীন করা হয়, তখন টেকনিশিয়ানরা সংঘবদ্ধ হলেও আর্টিস্ট ফোরাম শিল্পীদের স্বার্থরক্ষায় শক্তিশালী কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের।

Debjani Chatterjee, Tollywood, Actress, Bengali Television, Bengali Serial, দেবযানী চট্টোপাধ্যায়, টলিউড, অভিনেত্রী, বাংলা টেলিভিশন, বাংলা সিরিয়াল

সবশেষে দেবযানী চট্টোপাধ্যায় ইন্ডাস্ট্রির অভ্যন্তরীণ ‘হিপোক্রিসি’ এবং ‘প্রোডাকশন ফ্রেন্ডলি’ তকমার পেছনের অন্ধকার দিক বিশ্লেষণ করেন। তিনি জানান, কোনো শিল্পী যদি শুটিং ফ্লোরে নিজের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলেন বা পেশাদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেন, তবে তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে ‘নট প্রোডাকশন ফ্রেন্ডলি’ তকমা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ক্যামেরার সামনে এক রূপ এবং ক্যামেরার পেছনে সহকর্মীদের প্রতি চরম পেশাদারিত্বহীন আচরণ—এই মুখ ও মুখোশের খেলা ইন্ডাস্ট্রির সংস্কৃতিকে নষ্ট করছে। নিজের আত্মসম্মান বজায় রেখে তাই বর্তমানে টলিউডের এই জটিল সমীকরণ থেকে দূরে সরে মুম্বাইতে নতুন করে অডিশন দিচ্ছেন এবং ওটিটি ও বড় পর্দায় কাজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এই স্পষ্টবাদী অভিনেত্রী।

Back to top button