‘ভালো মানুষ হওয়াই আসল সাফল্য!’ ‘ইতিহাস কাউকেই মনে রাখে না!’ ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে ভীষণ সম্মান করতেন!’ জীবনের অজানা গল্প শোনালেন সব্যসাচী চক্রবর্তী!

বাংলা চলচ্চিত্র ও নাট্যজগতের অন্যতম জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় মুখ হলেন অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী (Sabyasachi Chakraborty)। ‘ফেলুদা’ হিসেবে বাঙালির ঘরে ঘরে নিজের বিশেষ পরিচিতি গড়ে তোলা এই প্রবীণ অভিনেতা তাঁর প্রাঞ্জল অভিনয়, গমগমে কণ্ঠ এবং স্পষ্টভাষী স্বভাবের জন্য চিরকালই দর্শকদের মন জয় করে এসেছেন। দীর্ঘ অভিনয় জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি অত্যন্ত বিনম্র ও মাটির কাছাকাছি একজন মানুষ। সম্প্রতি একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর জীবনের বিভিন্ন অজানা অধ্যায়, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জীবনের শেষ পর্বের ভাবনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।

পডকাস্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে উঠে আসে রাজনীতি ও টালিগঞ্জ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির তৎকালীন এবং বর্তমান নানা পরিস্থিতি। আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কথা স্মরণ করেন। সব্যসাচী বাবু জানান, আদর্শগত বা রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন সময়ের বহু মানুষ ও টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করত। সেই সময়ের প্রেক্ষাপট এবং শিল্প সংস্কৃতির জগতে নানা পরিবর্তনের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ ব্যক্ত করেন।

রাজনীতি ও সিনেমার পাশাপাশি অভিনেতার জীবনের অন্যতম বড় জায়গা জুড়ে রয়েছে বন্যপ্রাণী ও ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফি। সাক্ষাৎকারে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে তিনি বলেন, বন্যপ্রাণীদের কাছ থেকে মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে। সাধারণ জনজীবনের সঙ্গে বন্য জীবনের তুলনা টেনে তিনি মন্তব্য করেন যে, জন্তু-জানোয়ারদের মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা বা লোভ থাকে না; খাবার খাওয়া এবং বংশবৃদ্ধি ছাড়া তাদের আলাদা কোনো বাড়তি চাহিদা নেই। মানুষের জটিল জীবনের চেয়ে পশুপাখিদের এই সরলতা ও নিরপেক্ষতা তাঁকে বারবার আকর্ষণ করে।

সাক্ষাৎকারের শেষের দিকে সঞ্চালক যখন প্রশ্ন করেন— মানুষ তাঁকে কীভাবে মনে রাখুক বলে তিনি চান, তখন সব্যসাচী চক্রবর্তী এক অনন্য জীবনদর্শনের পরিচয় দেন। তিনি অত্যন্ত সহজ ভাষায় জানান যে, মানুষ তাঁকে সারাক্ষণ মনে রাখবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজের বক্তব্যকে স্পষ্ট করতে তিনি নীল আর্মস্ট্রং, ইউরি গ্যাগারিন, পেনিসিলিন আবিষ্কারক বা আলফ্রেড নোবেলের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের উদাহরণ টেনে বলেন, ইতিহাস বা মানুষ অনেক বড় বড় কাজকেও কালক্রমে ভুলে যায়। তাই আলাদা করে নিজেকে স্মরণীয় করে রাখার চেয়েও দৈনন্দিন জীবনে ভালো মানুষ হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ ‘আমি কাজ বেচতে এসেছি, নিজেকে নয়!’ ‘মায়ের সামনেই এসেছিল নোংরা অফার, বলা হয়েছিল…’ ‘এটা মেধা বিক্রির জায়গা, শরীর নয়!’ দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও কাজের অভাব! ইন্ডাস্ট্রির রাজনীতি থেকে নোংরা প্রস্তাব, অকপটে ত্রমিলা ভট্টাচার্য!

পরিশেষে এই প্রবীণ অভিনেতা প্রত্যেকের উদ্দেশ্যে এক অত্যন্ত মূল্যবান বার্তা প্রদান করেন। তিনি জানান, তারকা বা খ্যাতিমানদের মনে রাখার চেয়েও সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো নিজের বাবা-মা এবং শিক্ষকদের সবসময় স্মরণে রাখা ও সম্মান জানানো। জীবনের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একজন ভালো ও সৎ মানুষ হয়ে ওঠা, যাতে চারপাশের সমাজ ও পৃথিবীটা আর একটু সুন্দর হতে পারে। খ্যাতি ও প্রতিপত্তির ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর এই বাস্তবমুখী ও বিনয়ী ভাবনা বহু দর্শক ও অনুরাগীর হৃদয় স্পর্শ করেছে।

Back to top button