‘মেয়েটা বড্ড অল্প বয়সে ম’রে গেল…’ ‘বেঁচে থাকলে বোধহয় ও আরো বেশি ভুগতো, কারণ কিছু একটা সবসময়…’ ‘শুনুন আপনি এত কষ্ট পাবেন না কারণ আপনিও ম’রে যাবেন…’ পায়েলের স্মরণে জীবনের পরম সত্যি তুলে ধরলেন মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়!

বাংলা ও হিন্দি চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রাণবন্ত অভিনেত্রী মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের (Moushumi Chatterjee) রঙিন পর্দা জীবনের নেপথ্যে রয়েছে একের পর এক কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস। অত্যন্ত অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসা থেকে শুরু করে গ্ল্যামার জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার কঠিন লড়াই সবটাই তিনি পেরিয়েছেন পরম সাহসে। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়টি নেমে আসে যখন তিনি নিজের বড় মেয়ে পায়েলেকে এক মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে দেখেন এবং পরবর্তীতে তাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘ দিন অসুস্থ থাকার পর সন্তানকে অকালে হারানোর এই মর্মান্তিক যন্ত্রণা যেকোনো মায়ের মনকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তবুও জীবনের এই কঠিন আঘাত ও গভীর শোক কাটিয়ে তিনি অসীম ধৈর্যের সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।

সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অকালমৃত্যু ও সন্তান হারানোর গভীর বেদনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মৌসুমী দেবী জানান, কম বয়সে সন্তান হারানোর চেয়ে বড় কষ্ট আর কিছু হতে পারে না। তবে অত্যন্ত বাস্তবমুখী ও শান্ত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তাঁর মেয়ে বেঁচে থাকলে হয়তো শারীরিক ব্যাধিতে আরও অনেক বেশি কষ্ট পেত। চোখের সামনে প্রিয় সন্তানকে ধুঁকে ধুঁকে শারীরিক যন্ত্রণা পেতে দেখার চেয়ে মৃত্যু যে তাকে সমস্ত ব্যাধি থেকে মুক্তি দিয়েছে এই নির্মম সত্যটিকেই তিনি মন থেকে গ্রহণ করেছেন। একজন মায়ের পক্ষে এ কথা ভাবা অত্যন্ত কঠিন হলেও, সন্তানের যন্ত্রণামুক্তিকে প্রাধান্য দিয়েই তিনি নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন।

কথা প্রসঙ্গে অকালমৃত্যু এবং সন্তানহারা মায়েদের সান্ত্বনার পথ হিসেবে গৌতম বুদ্ধের একটি কালজয়ী শিক্ষার কথা স্মরণ করিয়ে দেন অভিনেত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, সন্তানহারা এক শোকার্ত মা যখন গৌতম বুদ্ধের কাছে গিয়েছিলেন তাঁর মৃত সন্তানকে বাঁচিয়ে দেওয়ার আকুতি নিয়ে, তখন বুদ্ধদেব তাঁকে এমন এক পরিবার থেকে একমুঠো সরষে এনে দিতে বলেছিলেন যে বাড়িতে কখনো কারো মৃত্যু হয়নি। কিন্তু পুরো নগর ঘুরেও এমন একটি বাড়ি পাওয়া যায়নি। এই কাহিনির উল্লেখ করে মৌসুমী দেবী বোঝাতে চেয়েছেন যে, প্রিয়জনকে হারানো এবং অকালমৃত্যু জীবনের পরম ও কঠিন সত্য। এই নির্মম বাস্তবতাকে কেউ কখনো এড়াতে পারে না, আর এটি মেনে নেওয়া ছাড়া মানুষের অন্য কোনো উপায় থাকে না।

এছাড়াও, সমাজ এবং অন্যান্য সন্তানহারা মায়েদের কষ্টের বাস্তব রূপটি তিনি তুলে ধরেন অত্যন্ত দরদী মন নিয়ে। দেশের সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত জোয়ান ও সেনাবাহিনীর পরিবারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, সীমান্তে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো তরুণ বীর সন্তানের প্রাণ যাচ্ছে এবং তাঁদের মায়েরা অসীম শূন্যতা বুকে চেপে বেঁচে আছেন। সেই মায়েরা দেশের জন্য সন্তানকে উৎসর্গ করেও জীবনসংগ্রামে লড়াই করে যাচ্ছেন। তাঁদের এই অপরিসীম শোক ও সংগ্রামের তুলনায় নিজের ব্যক্তিগত কষ্টকে তিনি সমব্যথী দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা করেন।

আরও পড়ুনঃ বিপদের মুখে পারুল-রুকু! কিডন্যাপারদের নতুন চালে থমকে গেল পারুলের জীবন! স্ত্রীকে বাঁচাতে কি করবে রায়ান?

সাক্ষাৎকারের সময় তিনি জানান, হোটেলে তাঁর এক অনুরাগী এসে পায়েলের অকালমৃত্যুর কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। কিন্তু মৌসুমী দেবী অত্যন্ত শান্ত মনে সেই অনুরাগী ও ভক্তদের বোঝান যে, অকালমৃত্যু যতই কষ্টদায়ক হোক না কেন, একে নিয়ে ক্রমাগত শোকাচ্ছন্ন হয়ে থাকা বা কেঁদে জীবন কাটানো উচিত নয়। একদিন আমাদের সকলকেই এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই শোকের কালো মেঘকে আঁকড়ে না ধরে, জীবনের বাকি দিনগুলোতে নিজেকে কাজের মধ্যে রাখা এবং অন্যদের মাঝে আনন্দ ও সুখ ছড়িয়ে দেওয়াই জীবনের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

Back to top button