লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন-এর মাঝেই থেমে গেছিল জীবন! মাত্র ৪৪ বছর বয়সেই সকলকে কাঁদিয়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা! বাংলার মানুষের স্মৃতির পাতায় অমর কুনাল মিত্র!

বাংলা অভিনয় জগতে এমন কিছু মুখ থাকে, যারা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেদের অভিনয় দক্ষতা আর হাসিখুশি ব্যক্তিত্ব দিয়ে মানুষের মনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যান। তাঁদের মধ্যেই একজন ছিলেন অভিনেতা কুনাল মিত্র (Kunal Mitra)। সুপুরুষ চেহারা, মিষ্টি হাসি আর স্বাভাবিক অভিনয় শৈলী দিয়ে তিনি বাঙালি দর্শকের হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মাত্র ৪৪ বছর বয়সেই থেমে যায় তাঁর জীবনের পথচলা। তাঁর এই হঠাৎ চলে যাওয়া বাংলা বিনোদন জগতের জন্য এক বিরাট ধাক্কা ছিল।

বাস্তব জীবনে খ্যাতনামা পরিচালক দেবকী কুমার বসুর নাতি বাসব মিত্র, অভিনয় জগতে পা রেখেছিলেন কুনাল মিত্র নামে। রেলের চাকরি কিংবা থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শুরু করে ছোট পর্দা ও বড় পর্দা সর্বত্রই তিনি নিজের দক্ষতার ছাপ রেখে গিয়েছিলেন। আলফা বাংলার জমবে মজা কিংবা পরবর্তীতে কুয়াসা যখন-এর মতো ধারাবাহিকের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন সময়ে বাংলা টেলিভিশনের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন। শুধু তাই নয়, ‘আলো’, ‘সংশয়’ কিংবা ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকের মনে অমলিন হয়ে রয়েছে।

উত্তম কুমারের অভিনয় শৈলীর সঙ্গে তাঁর চেহারার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পেতেন অনেকেই। ‘অতি উত্তম’ সিরিজের মতো কাজগুলোতে অভিনয় করার পর দর্শক তাঁকে ভালোবেসে “এ যুগের উত্তম কুমার” বলেও ডাকতে শুরু করেছিলেন। তাঁর সাবলীল সংলাপ বলার ধরণ এবং রোমান্টিক নায়ক থেকে শুরু করে সাধারণ চরিত্র ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা সবাইকে মুগ্ধ করত। কিন্তু সাফল্যের এই রঙিন আলো ঝলমলে পথের মাঝেই ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছিল এক কালো মেঘ। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, কাজের মানসিক চাপ এবং শারীরিক অবহেলার কারণে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে শুরু করে।

২০০৯ সালের ২১শে জানুয়ারি দিনটি বাংলা বিনোদন জগতের ইতিহাসে এক কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ‘উৎসবের রাত্রি’ ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন আচমকাই সেটে তীব্র বুক ব্যথায় অসুস্থ হয়ে পড়েন কুনাল। সহকর্মীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, কিংবা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার আগেই শুটিং ফ্লোরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই হাসিখুশি মানুষটি। আগের দিন রাতে এক সহকর্মীর বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে পরের দিন সকালেই স্টুডিওতে কাজে যোগ দেওয়া এই মারাত্মক ব্যস্ততা ও অনিয়মই যেন ক্যালিভার থাকা সত্ত্বেও কেড়ে নিল এক প্রতিভাবান প্রাণকে।

আরও পড়ুনঃ নদীর ধারে র’ক্তাক্ত অবস্থায় কেয়ারটেকার! মৃ’ত্যুর মুখ থেকে তাকে উদ্ধার করল পারুল-মল্লার! শিরিনের ষড়যন্ত্র থেকে কি মুক্তি পাবে রায়ান?

কুনাল মিত্রের এই অকাল প্রয়াণে তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান যেমন অসহায় হয়ে পড়েছিলেন, তেমনই পুরো টলিউড ইন্ডাস্ট্রি কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। একটি অসম্পূর্ণ ছবি ‘ছয় ছুটি’ এবং অনেকগুলো স্বপ্ন পেছনে ফেলে তিনি চিরদিনের জন্য চলে যান। আজ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা সিরিয়াল বা সিনেমার পাতা উল্টালে কুনাল মিত্রের সেই অমলিন হাসিটা আজও স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। তিনি হয়তো আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় কিছু তারা অকালেই ঝরে যায়, কিন্তু তাদের আলো চিরকাল থেকে যায়।

Back to top button