‘আলাদা করে নিজের সন্তানের আর অনুভূতিটাই নেই!’ ‘ওকে মানুষ করতে গিয়েই আমার মাতৃত্ব…!’ ‘আমার জীবনের শেষ ইচ্ছে একটাই…’ বিদায় নেওয়ার আগে কোন স্বপ্ন পূরণ করতে চান অভিনেত্রী? জানালেন অনন্যা সেনগুপ্ত?

টেলিভিশন পর্দার (Bengali Television) অত্যন্ত পরিচিত এবং দক্ষ অভিনেত্রী হলেন অনন্যা সেনগুপ্ত (Ananya Sengupta)। বিগত প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির সাথে যুক্ত রয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হওয়া অনন্যা একজন পেশাদার ভরতনাট্যম ও ক্রিয়েটিভ ড্যান্সার হিসেবে নিজের যাত্রা শুরু করতে চেয়েছিলেন। পরবর্তীতে পড়াশোনা শেষ করে কর্পোরেট চাকরিতে যোগ দিলেও, শেষ পর্যন্ত অভিনয়ের টানেই তিনি ক্যামেরার সামনে আসেন। বর্তমানে জি বাংলার জনপ্রিয় ধারাবাহিকে ‘মীনাক্ষী’র মতো একটি নেতিবাচক অথচ কমেডি মিশ্রিত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছেন।

অভিনয় জগতে আসার আগে অনন্যার জীবনটা ছিল বেশ অন্যরকম। তিনি কল্যাণী শহরের এক অত্যন্ত সুরক্ষিত ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছেন, যেখানে সাইকেল চালিয়ে স্কুল-কলেজে যাওয়া ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। পড়াশোনায় অত্যন্ত কৃতি অনন্যা বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পর বাবার ইচ্ছেতে এমবিএ ডিগ্রিও লাভ করেন। কিছুদিন রিসেপশনিস্ট এবং অন্যান্য কর্পোরেট সংস্থায় চাকরি করার পর ২০১২-১৩ সালের দিকে এক বন্ধুর মাধ্যমে হঠাৎ করেই বিজ্ঞাপনের অডিশন দিতে যান। প্রথম অডিশনেই ইমামি মাস্টার্ড অয়েলের বিজ্ঞাপনে সুযোগ পেয়ে যান এবং এর পর থেকেই মডেলিং ও হোডিং শুটের দুনিয়ায় তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

বিজ্ঞাপন থেকে ছোট পর্দায় আসার জার্নিটা অনন্যার জন্য ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। উইন্ডোজ প্রোডাকশন হাউসের ‘প্রাক্তন’ সিনেমাতে যীশু সেনগুপ্ত ও মিমি চক্রবর্তীর সাথে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করার সময় তাঁর প্রতিভা নজর কাড়ে সবার। এরপর অভিনেতা যীশু সেনগুপ্তের নিজস্ব প্রযোজনা সংস্থা থেকে তিনি ধারাবাহিকে অভিনয় করার মূল সুযোগটি পান। তবে কাজের প্রতি নিষ্ঠা বজায় রাখতে ২০১৬ সাল থেকে তিনি বিশিষ্ট থিয়েটার ব্যক্তিত্ব ও অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্তের কাছে প্রথাগত অভিনয় শিক্ষা ও গ্রুমিং নেওয়া শুরু করেন। এই প্রশিক্ষণই পরবর্তীতে তাঁকে ফ্লোরে যেকোনো কঠিন চরিত্রকে নিজের মতো করে ভেঙে নতুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

পেশাগত জীবনের পাশাপাশি অনন্যা সেনগুপ্তের ব্যক্তিগত জীবন এবং মাতৃত্বের গল্প সমাজকে এক নতুন দিশা দেখায়। ধারাবাহিকে আসার আগেই এক ইঞ্জিনিয়ারের সাথে তাঁর বিয়ে হয়, যিনি কাজের পাশাপাশি একজন অত্যন্ত ভালো লেখকও বটে। তবে অনন্যার মাতৃত্বের সংজ্ঞাটা আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। ২০০৭ সালে তাঁর এক ফ্ল্যাটের বান্ধবী ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’ থেকে একটি কন্যাসন্তান দত্তক নেন, যার নাম সরণ্যা। সেই ছোট্ট সরণ্যাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবেসে, আগলে রেখে বড় করেছেন অনন্যা। সরণ্যাকে মানুষ করতে গিয়ে তাঁর মনে নিজের ও অন্যের বাচ্চার মধ্যকার সমস্ত ভেদাভেদ মুছে যায় এবং তিনি কোনোদিন আলাদা করে নিজের বায়োলজিক্যাল সন্তানের প্রয়োজন বোধ করেননি।

আরও পড়ুনঃ শিরিনকে শোধরানোর শেষ সুযোগ দিলো পারুল! নিজেকে পাল্টাতে পারবে তো শিরিন? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

অনন্যা শুধু একজন দায়িত্বশীল মা-ই নন, তিনি একজন পরম পশুপ্রেমীও বটে। বর্তমানে তাঁর ফ্ল্যাটে চারটি উদ্ধার করা চারপেয়ে কুকুর ও বিড়ালের ছানা রয়েছে, যাদের তিনি নিজের সন্তানের মতোই যত্ন করেন। সমাজ ও পরিবারের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অনন্যা নিজের মানসিক শান্তি ও আদর্শে অটল থেকেছেন। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি তাঁর জীবনের এক মহৎ ইচ্ছার কথা প্রকাশ করে জানান যে, জীবনের শেষভাগে তিনি এমন একটি বড় আশ্রয়স্থল বা শেল্টার হোম তৈরি করতে চান যেখানে সমাজের বহু অনাথ ও পথশিশুরা মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে। নিজের অভিনয় দক্ষতা এবং এই মানবিক চিন্তাভাবনার কারণেই অনন্যা সেনগুপ্ত আজ বহু মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।

Back to top button