‘হাসপাতালের সেই অন্ধকার দিনগুলো…’ ‘আমি বুঝে যাই, কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারব আর কার সঙ্গে…’ ‘স্বামীকে হারানোর পর চারদিক ছিল শূন্য!’ সমস্ত শূন্যতা পেরিয়ে মালবিকা সেনের ঘুরে দাঁড়ানোর অসামান্য লড়াই!

মালবিকা সেন (Malabika Sen) নৃত্যের আঙিনায় এক চিরপরিচিত এবং অত্যন্ত উজ্জ্বল নাম। ওড়িশি ও ভরতনাট্যমের মতো ধ্রুপদী নাচে নিজের অনবদ্য দক্ষতা প্রমাণ করার পাশাপাশি ছোট পর্দায় অভিনয় জগতকেও তিনি সমৃদ্ধ করেছেন নিজ গুণে। রূপালী পর্দায় বা নাচের মঞ্চে যখন তিনি এসে দাঁড়ান, তাঁর চোখের চাহনি আর শারীরিক মুদ্রা দর্শকদের এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। কিন্তু এই ঝলমলে আলো, তালি আর খ্যাতির পেছনের মানুষটা যে কতটা কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এই অবস্থানে এসেছেন, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। সম্প্রতি এক পডকাস্টে জীবনের সেই না-বলা অন্ধকারের দিনগুলো সহজ সরল ভাষায় অকপটে ভাগ করে নিলেন এই গুণী অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী।
শৈশবে যিনি ছিলেন ভীষণ ভীতু, এক ফোঁটা রক্ত দেখলে বা ওষুধের কড়া গন্ধ পেলে যার জ্ঞান হারিয়ে যেত, নিয়তি তাঁকে এক চরম পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়টি আসে যখন তিনি তাঁর প্রিয় স্বামীকে হারান। সেই সাথে একে একে বাবা ও মায়ের মরণপণ অসুস্থতা এবং তাঁদের চিরতরে চলে যাওয়া যেন একটার পর একটা ভয়ঙ্কর কালবৈশাখী হয়ে তাঁর সাজানো সংসারকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। যে মানুষটি খাটের নিচে অন্ধকারকে ভয় পেতেন, জীবনের নির্মম পরিহাসে তাঁকেই দিনের পর দিন হাসপাতালের করিডোরে কাটাতে হয়েছে, লড়তে হয়েছে চিকিৎসকদের সাথে। এই চরম শোক আর একের পর এক আপনজনকে হারানোর শূন্যতাহীনতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভেতর থেকে এক ইস্পাতকঠিন মানুষে রূপান্তরিত করে।
এই মানসিক বিপর্যয় ও নিঃসঙ্গতার মাঝেও তিনি কিন্তু নিজের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ‘শিল্প’কে আঁকড়ে ধরেছিলেন। অভিনয় ও নাচের এই গ্ল্যামার জগতে টিকে থাকা কখনোই সহজ ছিল না। বিশেষ করে ক্লাসিক্যাল নাচকে পেশা হিসেবে নিয়ে আর্থিক স্থায়িত্ব বজায় রাখা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। মালবিকা জানান, শুধু মঞ্চে পারফর্ম করে সবসময় সংসার চালানো কঠিন, তাই তিনি তরুণ প্রজন্মকে নাচ শেখানোর গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। অভিনয়ের চিরচেনা ছক আর নাচের মুদ্রার মধ্যকার তফাতকে জয় করে ছোট পর্দায় নিজের জায়গা ধরে রাখতে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম ও প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙা-গড়ার খেলায় মেতে থাকতে হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘আমি কিন্তু কিছু ভুলিনি…’ ‘প্রাক্তন মানেই আমার কাছে…’ ‘আমার জীবনে আমার প্রাক্তনরা…’ প্রাক্তন বলতে কী বোঝেন গায়িকা? পুরনো সম্পর্ক নিয়ে অকপটে ইমন চক্রবর্তী!
দীর্ঘদিন এই রঙিন দুনিয়ায় পথ চলতে গিয়ে মানুষকে খুব কাছ থেকে চিনেছেন মালবিকা সেন। আলো আর অন্ধকারের এই জগতে কে আসল বন্ধু আর কে কেবলই সুসময়ের সঙ্গী, তা বোঝার এক অদ্ভুত সহজাত ক্ষমতা বা ‘ইনস্টিংক্ট’ তৈরি হয়ে গেছে তাঁর মধ্যে। তিনি এখন সহজেই বুঝতে পারেন কার সাথে প্রফেশনাল বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাখা উচিত আর কাকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা প্রয়োজন। প্রতারণা আর চড়াই-উতরাইয়ের এই পথ তাঁকে মানুষ চিনতে শিখিয়েছে, যার ফলে জীবনের জটিলতাগুলোকে তিনি এখন অনেক বেশি সহজভাবে মোকাবিলা করতে পারেন।
আজ জীবনের এই পর্যায়ে এসে মালবিকা সেনের কাছে তাঁর কাজই হলো ঈশ্বরের উপাসনা। তিনি বিশ্বাস করেন, নিজের ভেতরটাকে ভালো রাখা আর নিজের আত্মাকে ভালোবাসাই হলো আসল পুজো। সমস্ত মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি আর জীবনের ভয়ঙ্কর সব স্মৃতিকে পেছনে ফেলে তিনি যখন আজ মঞ্চে এসে দাঁড়ান, তখন দর্শকদের ভালোবাসাই তাঁকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়। সমস্ত শূন্যতা কাটিয়ে উঠে আবার নতুন করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর এই অনন্য গল্প কেবল একজন অভিনেত্রীর নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হেরে না গিয়ে লড়ে যাওয়া প্রতিটি মানুষের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

