‘মেয়ের টাকায় চলছি…’ ‘ধারদেনা আর লোনে জর্জরিত!’ ‘মোটা হলেও বাদ, রোগা হলেও বাদ, উপার্জনের রাস্তাটা…!’ কেমন আছেন শঙ্কর চক্রবর্তী? কিভাবে চলছে তাঁর জীবন? কঠিন সময় নিয়ে অকপটে অভিনেতা!

বাংলা বিনোদন জগতের অত্যন্ত পরিচিত এবং জনপ্রিয় একজন মুখ হলেন অভিনেতা শঙ্কর চক্রবর্তী (Shankar Chakraborty)। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর সাবলীল অভিনয় দিয়ে বাংলা দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছেন। নাটক, মেগা সিরিয়াল, সিনেমা থেকে শুরু করে যাত্রা সব মাধ্যমেই তাঁর সমান যাতায়াত। সাম্প্রতিক একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর অভিনয় জীবনের নানা চড়াই-উতরাই, পর্দার পেছনের বাস্তব সংগ্রাম এবং ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন। তাঁর সেই অকপট আড্ডা শুধু তাঁর অনুরাগীদেরই নয়, বরং পুরো বিনোদন প্রেমী মানুষকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।
এই সাক্ষাৎকারে অভিনেতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, পরিবারের সাফল্য এবং নিজের কিছু আর্থিক টানাপোড়েনের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে জানান যে তাঁর মেয়ে বর্তমানে মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতে একজন সফল কন্টেন্ট হেড হিসেবে কাজ করছেন, যিনি ইতিপূর্বে রেমো ডি’সুজার মতো বড় পরিচালকদের সাথেও কাজ করেছেন। তবে নিজের আর্থিক বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শঙ্করবাবু জানান যে, তিনি জীবনে খুব একটা টাকা জমাতে পারেননি। বিশেষ করে প্রতি সাড়ে তিন বছর অন্তর গাড়ি বদলানোর একটি প্রবল শখ থাকার কারণে তিনি ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। এই আর্থিক বাধ্যবাধকতা ও মেগা সিরিয়ালের মাসিক চুক্তির কারণেই অতীতে কৌশিক গাঙ্গুলীর ‘খাদ’ বা নন্দিতা-শিবপ্রসাদের মতো পরিচালকদের বড় চলচ্চিত্রের কাজ হাতছাড়া করতে হয়েছিল তাঁকে।
বর্তমান সিনেমা ও ওয়েব সিরিজের দুনিয়ায় গেড়ে বসা ‘বডি শেমিং’ এবং সৌন্দর্যের কৃত্রিম মানদণ্ড নিয়েও এই প্রবীণ অভিনেতা তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান যে, আজকাল অভিনয়ের দক্ষতার চেয়ে একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর শারীরিক গঠন, নাক বা ঠোঁটের আকৃতি কেমন, তা দিয়ে তাঁদের কাস্টিং বিচার করা হয়। শঙ্করবাবু নিজের উদাহরণ দিয়ে বলেন, যখন তিনি কিছুটা স্থূলকায় ছিলেন, তখন তাঁকে ওজন কমানোর কথা বলা হয়েছিল। অথচ এখন কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে রোগা করার পরেও স্রেফ একটি নির্দিষ্ট শারীরিক কাঠামোর দোহাই দিয়ে তাঁকে কিছু নতুন প্রজেক্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এই ধরণের অদ্ভুত বৈষম্যের কারণে সাধারণ দর্শকেরা ভালো অভিনয় দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
দীর্ঘ অভিনয় জীবনে অজস্র পুরস্কার ও সম্মান পেলেও মনের কোণে কিছু অপূর্ণ স্বপ্ন ও আক্ষেপ রয়ে গেছে এই গুণী শিল্পীর। থিয়েটারের মঞ্চে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখে স্বয়ং স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায় চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি এবং ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও যখনই বড় পর্দায় সুনীলবাবুর বায়োপিক তৈরির কথা ওঠে, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে প্রযোজকেরা শঙ্কর চক্রবর্তীর নাম বাদ দিয়ে অন্য কারও কথা চিন্তা করেন। এছাড়াও জীবনের এই ইনিংসে নাসিরুদ্দিন শাহ অভিনীত কোনো জটিল চরিত্র কিংবা শেকসপিয়রের ‘ওথেলো’র মতো কোনো কালজয়ী ও আইকনিক চরিত্রে কাজ করার তীব্র ইচ্ছা রয়েছে তাঁর, যা এখনও পূরণ হয়নি।
আরও পড়ুনঃ বিরাট দুঃসংবাদ! হৃদরোগে আক্রান্ত অভিনেতা! বুকে অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালে সুমন্ত মুখোপাধ্যায়!
পরিশেষে বলা যায়, শঙ্কর চক্রবর্তীর এই সাক্ষাৎকারটি বিনোদন জগতের চাকচিক্যের পেছনের এক কঠোর বাস্তবকে তুলে ধরে। সমস্ত অভাব-অনটন, কাস্টিংয়ের রাজনীতি এবং আক্ষেপকে দূরে সরিয়ে রেখে তিনি আজও মঞ্চে ও পর্দায় সমানভাবে সক্রিয়। নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের সাথে কাজ করার পাশাপাশি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একজন প্রকৃত অভিনেতা হিসেবেই তিনি বেঁচে থাকতে চান। অভিনয়ের প্রতি তাঁর এই আজীবন দায়বদ্ধতা ও সততাই তাঁকে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির এক অনন্য জীবন্ত কিংবদন্তি করে রেখেছে।

