‘ধিক তোমাকে হৈমন্তী, ছিঃ!’ ‘তখন মেজাজ গরম, বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম…’ ‘যেখানে মান্না দা ঐভাবে…সেখানে আমি কে?’ কেন নিজেকে ধিক্কার জানালেন বর্ষীয়ান গায়িকা হৈমন্তী শুক্লা?

বাঙালি সংগীতের স্বর্ণযুগের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হৈমন্তী শুক্লা (Haimanti Shukla)। যাঁর কণ্ঠের জাদুতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মুগ্ধ আপামর শ্রোতাকুল। সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই গুণী শিল্পী নিজের সংগীত জীবন এবং কিংবদন্তি শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা না-বলা গল্প তুলে ধরেন। আড্ডার মেজাজে তিনি স্পষ্ট জানান, সংগীতের আঙিনায় তিনি নিজেকে কখনোই সম্পূর্ণ সফল মনে করেন না। হৈমন্তী শুক্লার কথায়, “আমি নিজের গান খুব একটা শুনি না, শুনলে পরে খুঁতগুলো ভীষণ চোখে পড়ে। যারা আমার গান ভালোবাসেন তারা অনেক দয়ালু।” তাঁর সরল অভিব্যক্তি এবং নিখাদ বিনম্রতা আরও একবার প্রমাণ করে যে, প্রকৃত প্রতিভা কতটা মাটির কাছাকাছি হতে পারে।
এই স্মৃতিচারণের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিলেন বাংলা সংগীতের আরেক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ মান্না দে, যাঁকে হৈমন্তী শুক্লা আদর করে ‘মান্নাদা’ বলে ডাকতেন। মান্না দে-র সুর ও পরিচালনায় হৈমন্তী শুক্লার গাওয়া ‘আমার বলার কিছু ছিল না’ গানটি বাঙালির চিরকালীন পছন্দের তালিকায় অন্যতম। সেই গানের রেকর্ডিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে গায়িকা জানান, মান্না দে প্রথম দিকে গানটি তাঁকে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না, কারণ তিনি নিজেই এটি রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুরোধে শেষ পর্যন্ত গানটি হৈমন্তী শুক্লার ঝুলিতেই আসে। মান্না দে-র কাজ করার ধরণ এবং ব্যক্তিত্বের সেই গভীর প্রভাব আজও হৈমন্তী শুক্লার স্মৃতিতে অম্লান।
জনমানসে মান্না দে-র একটি গম্ভীর বা রাগী ইমেজ থাকলেও, হৈমন্তী শুক্লা তাঁর অভিজ্ঞতার ডালি উজাড় করে জানান যে মান্না দে আদতে ভীষণ রসিক মানুষ ছিলেন। অনেকেই হয়তো জানেন না যে, মান্না দে পুরোনো দিনের বিখ্যাত অভিনেতা ও কমেডিয়ান নবদ্বীপ হালদারের গলা হুবহু নকল করতে পারতেন। দূরবর্তী কোনো শো-তে যাওয়ার সময়ে গাড়ির দীর্ঘ যাত্রাপথে সহ-শিল্পীদের ক্লান্তি দূর করতে তিনি নবদ্বীপ হালদারের ঢঙে গলা পাল্টে কথা বলতেন এবং কৌতুক করতেন। হৈমন্তী শুক্লা হেসে মনে করেন, তিনি তখন মান্না দে-কে বলতেন, “আর করতে হবে না, গলায় লাগবে!” কিংবদন্তি এই গায়কের এই শিশুসুলভ এবং আমুদে রূপটি সাধারণ শ্রোতাদের কাছে একপ্রকার অজানাই ছিল।
সংগীতের কারিগরি দিক থেকে মান্না দে হৈমন্তী শুক্লাকে যে অত্যন্ত মূল্যবান শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাও এই সাক্ষাৎকারে উঠে আসে। মান্না দে সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, গান হওয়া উচিত সহজ-সরল যা সরাসরি মানুষের মনের মণিকোঠায় পৌঁছাতে পারে। তিনি হৈমন্তী শুক্লাকে বলতেন, “শোনো হৈমন্তী, কালোয়াতি করো না, ওটা সোজা করে গাও।” অর্থাৎ গানের মধ্যে জোর করে শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিল মারপ্যাঁক বা ওস্তাদি দেখানোর চেয়ে তার ভাব প্রকাশ করাটাই আসল। মান্না দে-র মতে, যে জটিলতা সাধারণ পাবলিক বুঝতেই পারবে না, তা জোর করে করার কোনো প্রয়োজন নেই। ওস্তাদজির এই শিক্ষাই হৈমন্তী শুক্লার গায়কীতে আজীবন প্রতিফলিত হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ উধাও আয়াপ্পানের গুপ্তধন! ফাঁকা বাক্স দেখে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল পারুলের! সৌমিত্র কাকুর আশঙ্কাই কি তবে সত্যি? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
সবচেয়ে বড় শিক্ষণীয় ঘটনাটি ঘটেছিল গ্রামীণ অঞ্চলের একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে। হৈমন্তী শুক্লা তখন নবীন ও অত্যন্ত জনপ্রিয়, অল্প বয়সের স্বভাবসুলভ কারণে বসার সুব্যবস্থা না থাকায় তিনি আয়োজকদের ওপর বেশ বিরক্ত হয়ে মেজাজ গরম করছিলেন। ঠিক সেই সময় আয়োজকরা তাঁকে নিয়ে যান মূল চত্বরে এবং সেখানে গিয়ে হৈমন্তী শুক্লা যা দেখেন, তা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। তিনি দেখেন, স্বয়ং মান্না দে ছাত্রদের বসার একটি সাধারণ কাঠের বেঞ্চের কোণায় গুটিসুটি মেরে বসে মাটির ভাঁড়ে নিশ্চিন্তে চা খাচ্ছেন। হৈমন্তী শুক্লা বলেন, “তখন আমার এত মনে হলো যে দেখ তোমাকে তুমি কে! মান্নাদা ওখানে বসে আরামস চা খাচ্ছেন।” এই অসাধারণ নিরহংকার রূপ এবং মাটির মানুষের মতো মানসিকতা দেখে হৈমন্তী শুক্লা নিজের অহংবোধকে আজীবনের মতো বিসর্জন দিতে শিখেছিলেন।

