‘মা যখন মা’রা যান, তাঁর কুড়িটা শাড়ি, একটা কম্বল আর অজস্র বই…’, ‘সপ্তর্ষিকে নিয়েও আমি ওনার কাছে গেছিলাম, জিজ্ঞাসা করেছিলাম…’ সমাজের একঘেয়ে মানসিকতায় বিরক্ত অভিনেত্রী! মা বাবার সম্পর্ক থেকে জীবন দর্শন, অকপটে সোহিনী সেনগুপ্ত!

বর্তমান প্রজন্মের বাংলা থিয়েটার এবং অভিনয় জগতের অন্যতম এক উজ্জ্বল ও শক্তিশালী নাম সোহিনী সেনগুপ্ত (Sohini Sengupta)। কিংবদন্তি নাট্যদম্পতি রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের সুযোগ্য কন্যা হিসেবে তিনি যেমন থিয়েটারের ঐতিহ্যকে বহন করছেন, তেমনই নিজের অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা দিয়ে মঞ্চ থেকে ওটিটি সবখানেই তৈরি করেছেন নিজস্ব এক দর্শকবলয়। সম্প্রতি একটি জনপ্রিয় ইউটিউব চ্যানেলে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হন এই গুণী অভিনেত্রী। অত্যন্ত সাবলীল ও আন্তরিক এই আড্ডায় উঠে এসেছে তাঁর জীবন, মা-বাবার স্মৃতি এবং থিয়েটার চর্চার নানান অজানা অধ্যায়, যা সাধারণ দর্শক ও অনুরাগীদের মধ্যে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।

এই দীর্ঘ আড্ডায় সোহিনী তাঁর ছোটবেলা থেকে শুরু করে থিয়েটার জীবন জুড়েই সমাজের তৈরি করা কিছু চেনা মানসিকতার মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। তিনি জানান, ছোটবেলা থেকেই সাধারণ মানুষকে একটি গণ্ডির মধ্যে বড় করা হয় যে বিজ্ঞান নিয়ে পড়লে বা তথাকথিত নিরাপদ চাকরি করলেই জীবনে সফল হওয়া যায়। অভিনয় বা থিয়েটারের মতো শিল্পচর্চাকে সমাজ এখনও পূর্ণাঙ্গ পেশা হিসেবে সহজে মেনে নিতে পারে না। তিনি যখন গর্বের সাথে বলেন যে তিনি থিয়েটার করেন, তখন মানুষ তাকে পাল্টা প্রশ্ন করে “আর কী করো?” ছোটবেলা থেকে নাটকের আবহে বড় হওয়া সত্ত্বেও পেশা হিসেবে থিয়েটারকে খাটো করে দেখার এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটি নিয়ে তিনি তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

আলোচনার একপর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে ইতিহাসের কথা এবং সেই সূত্রে সঞ্চালকের পক্ষ থেকে থিয়েটার জগতের অন্যতম প্রতিভাবান ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব প্রয়াত কেয়া চক্রবর্তীর নাম উত্থাপন করা হয়। রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের সম্পর্কের সমীকরণ ও নান্দিকারের অতীতের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে কেয়া চক্রবর্তীর স্মৃতিটি থিয়েটার মহলে অত্যন্ত আবেগঘন এবং কিছুটা সংবেদনশীল হিসেবেই পরিচিত। সাক্ষাৎকারে এই বিষয়ের অবতারণা পুরোনো নাট্যপ্রেমীদের মনে নান্দিকারের সেই সোনালী দিন ও ইতিহাসের নানা চর্চিত অধ্যায়কে আবারও নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে।

সাক্ষাৎকারটির আরেকটি চমকপ্রদ ও সংবেদনশীল অংশ ছিল সোহিনীর শৈশবের এক অদ্ভুত স্মৃতিচারণ। তিনি জানান, ছোটবেলায় যখন তিনি এলাহাবাদে ছিলেন, তখন একজন সাধু বাবার কাছ থেকে তিনি একটি আস্ত পাইথন বা অজগর সাপ নিয়ে এসেছিলেন। সেই সাপটি নাকি দীর্ঘ সময় ওঁর শরীরের সাথে জড়িয়ে থাকত এবং তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই সেটির সাথে খেলা করতেন। আজকের দিনে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং পশু অধিকারের কড়া নিয়মের নিরিখে ঘরের ভেতর এমন বিপজ্জনক সাপ রাখার বিষয়টি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বা আইনগত দিক থেকে সংবেদনশীল শোনালেও, এটি ছিল ওঁর বহু বছর আগের এক একান্তই শৈশবের নির্ভীক স্মৃতির অংশ।

আরও পড়ুনঃ বিরাট দুঃসংবাদ! এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন সংগীত জগৎ! ৭০ বছর বয়সে প্রয়াত কিংবদন্তি গায়িকা! শোক প্রকাশ করলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী!

আড্ডার শেষ অংশে এসে মায়ের স্মৃতিচারণে কিছুটা আবেগঘন হয়ে পড়েন সোহিনী। তিনি জানান, বিশিষ্ট অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর ঘরে সামান্য কিছু সাধারণ শাড়ি, একটি কম্বল এবং নামমাত্র গয়না ছাড়া আর বিশেষ কোনো বৈষয়িক সম্পদ ছিল না, যা ওঁর মায়ের অতি সাধারণ ও আড়ম্বরহীন জীবনযাত্রার এক পরম বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সব মিলিয়ে, কোনো রকম কৃত্রিমতা ছাড়াই সোহিনী সেনগুপ্তের এই সাক্ষাৎকারটি যেমন একদিকে সুস্থ সংস্কৃতির এক চমৎকার মেলবন্ধন, তেমনই অন্যদিকে সমাজ ও ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিককে স্পর্শ করে যাওয়ার কারণে এটি সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে এক গভীর আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।

Back to top button