‘মিথ্যাবাদীদের সামনে আমি একটি আয়না,’ ‘সু’ইসাইড রুখতে মেন্টাল হেলথ…’ ‘বড়লোকেরা পার পেয়ে যায়, লা’থি পড়ে গরিবের পেটে!’ টলিউডের ভণ্ডামির বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন শ্রীলেখা মিত্র!

বাংলা সিনেমা জগতের (Tollywood) অত্যন্ত জনপ্রিয় অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্র (Sreelekha Mitra)। অভিনয় দক্ষতার পাশাপাশি ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর আরও একটি বড় পরিচয় রয়েছে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টবক্তা এবং প্রতিবাদী। টলিউডের আর পাঁচজন অভিনেতা-অভিনেত্রীর মতো তিনি স্রোতে গা ভাসাতে পছন্দ করেন না। অন্যায় দেখলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা প্রকাশ্য মঞ্চে সোচ্চার হন। আর এই আপসহীন স্বভাবের কারণেই অনেক সময় তাঁকে ইন্ডাস্ট্রির একাংশের রোষানলে পড়তে হয়েছে, হারাতে হয়েছে কাজ। তবুও নিজের আত্মসম্মান ও আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার অলিন্দে তেল মারতে রাজি নন এই অভিনেত্রী। সম্প্রতি এক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে টলিউডের অন্দরমহলের নোংরা রাজনীতি এবং নিজের সাথে হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে আবারও গর্জে উঠলেন তিনি।
কিছুদিন আগে টেকনিশিয়ান স্টুডিওর একটি সভায় শ্রীলেখা মিত্রকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল। সেই ঘটনার পেছনের আসল ও বিতর্কিত সত্যটি এবার সামনে এনেছেন অভিনেত্রী। রাহুল নামক এক টেকনিশিয়ানের আকস্মিক মৃত্যুর পর আর্টিস্ট ফোরাম ও ফেডারেশনের ওই যৌথ সভায় বিনোদন জগতের কর্মীদের সেফটি, সিকিউরিটি এবং বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন শ্রীলেখা। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সামনে এই জরুরি বিষয়ে মুখ খুলতেই তাঁর হাত থেকে মাইক কেড়ে নেওয়া হয়। একপ্রকার জোর করেই তাঁকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো বড় তারকারা সেখানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেউ তাঁর সমর্থনে এগিয়ে আসেননি। এই চরম অপমান, অসম্মান আর ক্ষোভের কারণেই সেদিন চোখে জল নিয়ে স্টুডিও ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি, যা কোনো সাজানো মেলোড্রামা ছিল না।
এই ঘটনার সূত্র ধরেই শ্রীলেখা টলিউড ইন্ডাস্ট্রির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া নোংরা রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন। তিনি সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে। অভিনেত্রীর স্পষ্ট অভিযোগ, বাম আমলে কে কাকে ভোট দিচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামানো হতো না, কিন্তু তৃণমূল আসার পর থেকেই ঝাঁকে ঝাঁকে সিনেমার মানুষ ক্ষমতার লোভে শাসকদলে যোগ দিয়েছেন। এর ফলে বিনোদন জগতটাই এখন বেডরুম থেকে শুরু করে শুটিং ফ্লোর পর্যন্ত রাজনীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার এই নোংরা খেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ ও নিচু স্তরের টেকনিশিয়ানরা। অথচ বড় বড় নেতা-নেত্রীরা পরিস্থিতি বেগতিক দেখলেই গিরগিটির মতো রঙ বদলে অন্য দলে আশ্রয় নিচ্ছেন, কিন্তু সাধারণ গরিব কর্মীদের পেটে লাথি মারতেও এই তথাকথিত প্রভাবশালীরা দ্বিধাবোধ করছেন না।
ইন্ডাস্ট্রিতে শ্রীলেখা মিত্রকে অনেকেই ‘রুড’ বা অহংকারী বলে তকমা দিয়ে থাকেন। এই বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে অভিনেত্রী বলেন, যারা নিজেরা চোর, মিথ্যাবাদী এবং ভণ্ড তাদের সামনে শ্রীলেখা মিত্র একটা আয়নার মতো কাজ করে। আয়নায় যখন এই মানুষগুলো নিজেদের কুৎসিত আসল চেহারাটা দেখতে পায়, তখনই তারা ভয় পেয়ে যায়। সেই কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে তাঁকে একা করে রাখার চেষ্টা করা হয়, যাতে তিনি কোনো সত্যি কথা ফাঁস না করতে পারেন। শ্রীলেখার কথায়, তিনি কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য চলেন না। ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে কিংবা তেল মেরে পাঁচটা অডি গাড়ি বা বিলাসবহুল বাড়ি কেনার চেয়ে নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখাটা তাঁর কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুনঃ বিরাট দুঃসংবাদ! টানা শুটিংয়ের মাঝেই হাসপাতালে ভর্তি জনপ্রিয় শিল্পী! ‘হঠাৎ করে বুকের মধ্যে…’ ঠিক কি হয়েছে তাঁর? এখন কেমন আছেন তিনি?
এই পুরো বিতর্কটি টলিউডের ভেতরের এক অন্ধকার দিককে সাধারণ মানুষের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। শ্রীলেখা মিত্রের এই বিস্ফোরক বয়ান প্রমাণ করে যে, বাংলা চলচ্চিত্র জগতে স্বাধীনভাবে সত্যি কথা বলার বা প্রতিবাদের কোনো জায়গা নেই। ক্যামেরার সামনে অভিনয় করার চেয়েও টলিউডের বর্তমান তারকারা ক্যামেরার পেছনে ক্ষমতার লোকেদের খুশি করতে বেশি দক্ষ অভিনয় করছেন। প্রশ্ন উঠছে, একজন সিনিয়র অভিনেত্রীর সাথে যদি প্রকাশ্য সভায় এমন নজিরবিহীন দুর্ব্যবহার করা হতে পারে, তবে নতুন বা সাধারণ শিল্পীদের অবস্থা কতটা শোচনীয়? শ্রীলেখার এই সাহসিকতা টলিউডের ভণ্ডামির মুখোশ টেনে খুলে দিয়েছে, যা আগামী দিনে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে এক বড়সড় বিতর্কের ঝড় তুলতে চলেছে।

