অভিজ্ঞ অভিনেত্রী হয়ে সামান্য টাকায় কাজ করে লাভ নেই! ‘প্রাপ্য পারিশ্রমিক না পেলে কাজ করব না!’ ‘এখন কাজ পাওয়ার পদ্ধতি বদলে গেছে, কাজ পেতে গেলে আজকাল…’ টলিপাড়ার অন্ধকার দিক নিয়ে অকপটে দেবপর্ণা পাল চৌধুরী!

বাংলা টেলিভিশন (Bengali Television) জগতের পরিচিত মুখ এবং দক্ষ অভিনেত্রী দেবপর্ণা পাল চৌধুরী (Debaparna Paul Chowdhury) সাম্প্রতিক তার একটি সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে এই মুহূর্তে টলিপাড়ায় জোর চর্চা শুরু হয়েছে। দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয় করা দেবপর্ণা তাঁর স্পষ্ট কথার জন্য পরিচিত। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সে নাচের মাধ্যমে অভিনয় দুনিয়ায় পা রাখা এই অভিনেত্রী লিড রোল থেকে শুরু করে পার্শ্ব চরিত্র বা খলনায়িকা সব ধরনের চরিত্রেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ‘বোঝেনা সে বোঝেনা’র মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে গেঁথে রয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান পরিস্থিতি, কাস্টিংয়ের ধরন এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে তিনি এমন কিছু বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন, যা নতুন করে এক বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

অভিনেত্রীর তোলা সবচেয়ে বড় বিতর্কটি হলো বর্তমানের ‘কাজ পাওয়ার পদ্ধতি’ নিয়ে। দেবপর্ণা সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে এখন টলিউডে অভিনয়ের যোগ্যতার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার সংখ্যা দেখে কাস্টিং করা হচ্ছে। তাঁর এই মন্তব্য ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় অন্ধকার দিককে সামনে এনে দিয়েছে। বর্তমান যুগে যেখানে সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা সহজেই বড় বড় প্রজেক্টে সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন, সেখানে দেবপর্ণার মতো অভিজ্ঞদের একাংশের দাবি ফলোয়ার দেখে নয়, বরং অভিনয় দক্ষতা এবং ক্রাফটের ওপর ভিত্তি করেই এটলিস্ট সবাইকে একটা ফেয়ার বা ন্যায্য সুযোগ দেওয়া উচিত। এই ‘ফলোয়ার বনাম প্রতিভা’র লড়াই টলিপাড়ার কাস্টিং ডিরেক্টরদের মনোভাব নিয়েই বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল।

দ্বিতীয়ত, মেগা সিরিয়াল থেকে দেবপর্ণার দীর্ঘদিন দূরে থাকা এবং তাঁর পারিশ্রমিক নিয়ে করা মন্তব্যটি ইন্ডাস্ট্রির অর্থনৈতিক বৈষম্যকে প্রকাশ্যে এনেছে। অভিনেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রাপ্য পারিশ্রমিক বা রেমিউনারেশন না পেলে তিনি কাজ করবেন না, কারণ এত বছরের কেরিয়ারে তিনি নিজের একটা সম্মানজনক জায়গা তৈরি করেছেন। এই বক্তব্যটি টলিউডের সেই চিরাচরিত বিতর্ককে উস্কে দেয়, যেখানে অভিজ্ঞ শিল্পীদের যোগ্য সম্মান ও পারিশ্রমিক না দিয়ে অনেক সময় সস্তায় নতুন মুখ দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এই কারণে বহু গুণী শিল্পী দিনের পর দিন ঘরে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কোনো সুস্থ চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রির লক্ষণ হতে পারে না।

বিতর্কের আরেকটি বড় দিক হলো বিনোদন জগতে রাজনীতির অনুপ্রবেশ। দেবপর্ণা কোনো রাখঢাক না করেই বলেছেন যে ইন্ডাস্ট্রিতে একটা স্পষ্ট রাজনৈতিক বদল ঘটেছে এবং এর একটা গভীর প্রভাব কাজের ওপর পড়ছে। তিনি সাফ জানান, সরকার বা রাজনৈতিক দল যাই আসুক না কেন, তাঁর কিছু যায় আসে না, কিন্তু রাজনীতির কারণে যেন কোনো যোগ্য শিল্পী কাজ থেকে বঞ্চিত না হন। টলিউডের একটা বড় অংশ এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিভক্ত, আর দেবপর্ণার এই মন্তব্য আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে কীভাবে দলবাজি বা রাজনীতির সমীকরণের কারণে অনেক প্রতিভাবান অভিনেতা-অভিনেত্রী আজ কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

আরও পড়ুনঃ পল্লবীকে নিজের হাতে ব্রেসলেট পরিয়ে দিল আদিত্য! ব্রেসলেট ফেরানোর বাহানায় কাছাকাছি আদিত্য-পল্লবী! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

পরিশেষে বলা যায়, দেবপর্ণার এই সাক্ষাৎকারটি টলিউডের ভেতরের ক্ষোভ আর বাস্তবতাকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। চেনা মানুষগুলোর বদলে যাওয়া, কাজের পরিবেশ নষ্ট হওয়া এবং যোগ্যদের বদলে শুধু বাহ্যিক জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া এই সবকটি বিষয়ই প্রমাণ করে যে বাংলা বিনোদন জগৎ এখন এক চরম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেবপর্ণার এই স্পষ্ট এবং সাহসী বক্তব্য আগামী দিনে ইন্ডাস্ট্রির কাস্টিং পলিসি এবং কাজের পরিবেশ কতটা স্বচ্ছ করতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এই সাক্ষাৎকার যে স্টুডিও পাড়ার অন্দরে একটা বড়সড় নাড়া দিয়ে গেল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

Back to top button