‘সব আলোচনার পর বলল ওনার সঙ্গে আমায়…!’ ‘ মাকে শুনতে হয়েছে শুয়েই কাজ পেয়েছি!’ ‘সারাদিন কেঁদেছিলাম…’ ‘একবার আমার সঙ্গে অনেক বড় চিটিংবাজি…’ কেরিয়ারের শুরুতে প্রতারণার শিকার! মা-কে শুনতে হয়েছিল নোংরা কটূক্তি! ‘রাঙামতি’ হতে গিয়ে কতটা কাদা পেরোতে হয়েছে মনীষাকে?

স্টার জলসার (Star Jalsha) জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘রাঙামতি তীরন্দাজ’-এর হাত ধরে বর্তমানে বাঙালি দর্শকের ঘরের মেয়ে হয়ে উঠেছেন অভিনেত্রী মনীষা মণ্ডল (Manisha Mandal)। বহরমপুরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে মনীষা, যাঁর পরিবারের প্রায় প্রত্যেকেই শিক্ষকতা পেশার সাথে যুক্ত। ছোটপর্দায় তাঁর এই ‘রাঙামতি’ চরিত্রটি দর্শকদের কাছে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে গ্ল্যামার দুনিয়ার এই সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ একাকীত্ব এবং কঠিন লড়াইয়ের ইতিহাস। এক সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের স্ট্রাগল, অভিনয় জার্নি এবং ইন্ডাস্ট্রির কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা মুখ খুললেন এই অভিনেত্রী।

ছোটবেলা থেকেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সিনেমার ডায়লগ বলা আর নাচের প্রতি টান থেকেই মনীষার অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসার জন্ম। তবে শিক্ষক পরিবারের মেয়ে হওয়ায় শুরুতে বাড়ি থেকে এই সিদ্ধান্তকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। নিজের ইচ্ছেকে ডানা মেলতে কল্যাণীর নাট্যচর্চা কেন্দ্র এবং পরবর্তীতে কলকাতার ‘পাইকপাড়া আখর’ থিয়েটার দলের সাথে যুক্ত হয়ে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ শুরু করেন তিনি। নিজের চেষ্টা এবং অডিশনের মাধ্যমেই আজকের এই পরিচিতি তৈরি করেছেন মনীষা। সাক্ষাৎকারে নিজের আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি খুব আন্ডার কনফিডেন্ট একজন মানুষ। আমি এতদূর এসেছি নিজেকে নিজের চেষ্টায়…আমি জানি যে আমার মধ্যে একটু হলেও ট্যালেন্ট আছে।” তাঁর এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে, নিজের প্রতি বিশ্বাস এবং প্রতিভা থাকলে সমস্ত বাধা পেরিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব।

ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার শুরুর দিনগুলো কিন্তু মনীষার জন্য মসৃণ ছিল না, বরং আর্থিক টানাটানির সুযোগ নিয়ে অনেকেই তাঁকে ঠকানোর চেষ্টা করেছে। কেরিয়ারের একদম শুরুতে কাজের লোভ দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে ৫০০০ টাকা চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু সম্বল না থাকায় তিনি ৭০০ টাকা দিয়ে প্রতারিত হন। সেই যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা মনে করে অভিনেত্রী জানান, “আমি একবার স্ক্যামড হয়েছিলাম, আমার ৭০০ টাকা চলে গেছিল…তখন আমি কল সেন্টারে জব করতাম, টিউশন পড়াতাম। সেই সময় ৭০০ টাকাটা আমার কাছে প্রচন্ড ম্যাটার করতো, আমি সারাদিন কেঁদেছিলাম।” বাবার কাছ থেকে টাকা না নিয়ে কলকাতায় নিজের খরচ নিজে চালানোর সেই মরিয়া দিনগুলোতে এই প্রতারণা তাঁর লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছিল।

টাকা চুরির পাশাপাশি বিনোদন জগতের অন্য এক অন্ধকার দিক, অর্থাৎ ‘কাস্টিং কাউচ’ বা কুপ্রস্তাবের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল তাঁকে। একটি কাজের সমস্ত আলোচনা শেষে তাঁকে সরাসরি কম্প্রমাইজ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। মনীষা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সেই পরিস্থিতি সামলান এবং কুপ্রস্তাবদাতাকে ব্লক করে দেন। সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সমস্ত ডিসকাশন হয়ে যাওয়ার পরে লাস্টে বলল এটা কিন্তু তোমাকে কমপ্রমাইজ করতে হবে। আমি বললাম হয়তো আমি ভেবেছি টাকা-পয়সা কমপ্রমাইজ করার কথা বলছে…তারপরে উনি যখন বুঝলেন, আমি বললাম আমি ইংলিশে মাস্টার্স করেছি, কম্প্রমাইজ মানে জানব না? তারপরে সঙ্গে সঙ্গে ব্লক।” প্রথমদিকে বুঝতে না পারলেও, কুপ্রস্তাবের আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হতেই তিনি যে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা নতুনদের জন্য এক বড় শিক্ষা।

আরও পড়ুনঃ পারুলের বুদ্ধিতে বাজিমাত! সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে ঘরে ঢুকতেই পুলিশের চোখে চরম বিস্ময়! কি দেখে থতমত খেয়ে গেল অফিসার? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

একজন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ের এই গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডে আসাকে সহজভাবে নেয়নি সমাজ ও আত্মীয়দের একাংশ, যার খেসারত দিতে হয়েছিল তাঁর মা-কে। সমাজ ও প্রতিবেশীদের একাংশ তাঁর মাকে প্রতিনিয়ত নোংরা সামাজিক কটূক্তি করত. মনীষা অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানান, “মাকে অনেক খারাপ ভাষাতেই বলা হয়েছিল এই দুনিয়ায় গেছে মানে হয়তো শুয়েই কাজ পেয়েছে, এরকম আমার মাকে শুনতে হয়েছে।” তবে সমস্ত নেতিবাচকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মনীষা তাঁর মাকে সান্ত্বনা দিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে সততা আর পরিশ্রমের জোরেই এই ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের জায়গা পাকা করা যায়, কোনো অনৈতিক উপায়ে নয়। সব মিলিয়ে, মনীষার এই সাক্ষাৎকারটি গ্ল্যামারের পিছনের কঠিন বাস্তবকে যেমন তুলে ধরে, তেমনই নতুন প্রজন্মের কাছে এক অন্যতম অনুপ্রেরণাও বটে।

Back to top button