‘নতুন মুখ অভিনেত্রীরা যে টাকা ইনকাম করে, শিক্ষিত ব্যক্তি সেটা করতে পারে না!’ ‘সাফল্য আর টাকার হাতছানিতে মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে!’ ‘না জেনে বুঝে রাজনীতিতে ঢুকে পড়ছে!’ নতুন প্রজন্মকে নিয়ে অকপটে শাস্বতী গুহঠাকুরতা!

কলকাতা দূরদর্শনের সোনালী দিনের অত্যন্ত পরিচিত মুখ, বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী তথা প্রবীণ অভিনেত্রী শাস্বতী গুহঠাকুরতা (Saswati Guhathakurta) বর্তমান বিনোদন জগতের আমূল পরিবর্তন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নতুন প্রজন্মের মানসিকতা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছেন। তাঁর দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার নিরিখে টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এক গভীর ও স্পষ্ট বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর মতে, তাঁদের সময়ে দূরদর্শন বা বিনোদন জগতের যে পারিবারিক ও সুস্থ পরিবেশ ছিল, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে তা অনেকটাই বদলে গেছে। গ্ল্যামার দুনিয়ার এই বিবর্তনকে তিনি ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিক থেকেই মূল্যায়ন করেছেন।

সাক্ষাৎকারে বর্তমান টলিউডের অন্যতম বড় চর্চিত বিষয় শিল্পী ও রাজনীতির যোগসূত্র নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট কথা বলেছেন শাস্বতীদেবী। তিনি জানান, ১৯৭৫ সালে যখন তিনি দূরদর্শনে কাজ শুরু করেন, তখন সবকিছুর মধ্যে এভাবে রাজনীতির রঙ লেগে যায়নি। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ক্ষমতার এই সমীকরণকে এড়িয়ে চলা মুশকিল হয়ে পড়েছে। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, এখন অনেক শিল্পীই নিজের ইচ্ছেয় রাজনৈতিক রঙ মাখেন না, বরং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বা টিকে থাকার লড়াইয়ের কারণে তাঁদের কোনো না কোনো দলের ছাতার তলায় আসতে বাধ্য করা হয়। আবার উল্টোদিকে, কাজ পাওয়ার বাড়তি সুবিধা বা নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়ার তাগিদেও অনেকে নিজে থেকে রাজনৈতিক শিবিরে নাম লেখান।

টলিউডের বর্তমান কাস্টিং পদ্ধতি এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব নিয়েও প্রবীণ এই অভিনেত্রী রূঢ় বাস্তবকে তুলে ধরেছেন। আজকাল যোগ্যতা বা অভিনয়ের দক্ষতার চেয়ে ইনস্টাগ্রামের ফলোয়ার সংখ্যা দেখে অভিনয়ে সুযোগ দেওয়া হয় এমন একটি বিতর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই টালিপাড়ায় কান পাতলে শোনা যায়। শাস্বতীদেবী স্বীকার করেন যে, এই রটনা কিন্তু পুরোপুরি মিথ্যে নয়। প্রযোজনা সংস্থা বা চ্যানেলগুলো নিজেদের কাজের রিচ বাড়ানোর জন্য অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেয়। তবে তিনি আশাবাদী যে, এর মধ্যেও বহু যোগ্য শিল্পী নিজেদের মেধার জোরে টিকে আছেন এবং কিছু নতুন মুখ প্রথম দিকে কাজ না জানলেও ফ্লোরে কাজ করতে করতেই অভিনয়টা শিখে নিচ্ছেন।

এর পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের অভিনেতাদের রাতারাতি বিপুল অর্থ ও সস্তা জনপ্রিয়তার হাতছানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি। তিনি একটি বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বলেন, একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা অধ্যাপককে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে এবং ভালো টাকা রোজগার করতে বছরের পর বছর কঠিন পরিশ্রম ও পড়াশোনা করতে হয়। কিন্তু বিনোদন জগতে একটি সুন্দর মুখ বা সাধারণ অভিনয় জানা কোনো তরুণ-তরুণী যদি একটি মাত্র প্রজেক্টে সফল হয়ে যায়, তবে সে রাতারাতি প্রচুর টাকা ও লাইমলাইট পেয়ে যায়। সঠিক পারিবারিক শিক্ষা ও মানসিক পরিপক্কতা না থাকলে এই হঠাৎ পাওয়া বিপুল সাফল্য অনেকেরই মাথা ঘুরিয়ে দেয় এবং তীব্র মোহের বশে তাঁরা ভুল পদক্ষেপ ফেলে বসেন।

আরও পড়ুনঃ ফের পর্দায় ‘ফেলুদা’! দীর্ঘদিন পর একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী! জুটিতে ফিরছেন সব্যসাচী চক্রবর্তী ও মিঠু চক্রবর্তী? কবে থেকে কোন চ্যানেলে দেখা যাবে তাঁদের?

তবে বর্তমান পরিস্থিতির এত অন্ধকারের মধ্যেও নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর স্নেহ ও ভরসা অটুট রয়েছে। তিনি তরুণ তারকাদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই গ্ল্যামার দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে কোন জায়গায় ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে আর কোন জায়গায় শক্ত হয়ে ‘না’ বলতে হবে সেই সীমারেখাটা জানা খুব জরুরি। বিনোদন জগতের মানুষ যেন লোভের হাতছানিতে পা না দিয়ে শুধু নিজের কাজের প্রতি সৎ থাকেন।

Back to top button