‘সত্যজিৎ রায়কে রোজ চিঠি লিখতাম আর তার উত্তরও পেতাম…’ ‘আমাকে কাজে নিয়েও বাদ দিয়ে দিয়েছে…’ ‘একমাত্র শিবপ্রসাদ আমাকে…’ কখনো মিলেছে সম্মান, আবার কখনো জুটেছে অবহেলা! নিজের জীবনের অজানা গল্প নিয়ে অকপটে অনুসূয়া মজুমদার!

বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে বাঙালি দর্শকের মনের মণিকোঠায় রাজত্ব করছেন অভিনেত্রী অনুসূয়া মজুমদার (Anashua Majumdar)। নিজের বহুমুখী অভিনয় প্রতিভা দিয়ে তিনি বারবার দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। তবে অনুসূয়া মানেই শুধু পর্দায় ফুটিয়ে তোলা একঝাঁক চরিত্র নয়, তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি থিয়েটার, সিনেমা এবং বহুজাতিক কোম্পানির কর্পোরেট চাকরিকে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন। সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর জীবনের এমন কিছু আকর্ষণীয় অধ্যায় এবং টলিউড ইন্ডাস্ট্রির এক অন্ধকার বাস্তব তুলে ধরেছেন, যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
একটা সময় তিনি কলকাতার এক নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির চা বিভাগে টানা ৩২ বছর চাকরি করেছেন। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কোনো কাজ বকেয়া না রেখে তিনি নিখুঁতভাবে কর্পোরেট দায়িত্ব সামলাতেন। এরপর অফিস শেষ হতেই সমস্ত ক্লান্তি ভুলে সোজা চলে যেতেন থিয়েটারের মহড়ায়, আবার উইকেন্ডে চলত ডাবল শো-এর ব্যস্ততা। একই সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথক নৃত্যের রেওয়াজও চলত তাঁর। বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে যখন একজন মানুষ একটা কাজ সামলাতেই হিমশিম খান, সেখানে অনুসূয়া মজুমদার যেভাবে নিজের শতভাগ ফোকাস ধরে রেখে চাকরি ও শিল্পচর্চাকে সমান্তরালে চালিয়ে গেছেন, তা এক কথায় অনন্য এবং ভীষণ অনুপ্রেরণাদায়ক।

তবে এই উজ্জ্বল কেরিয়ারের আড়ালে থাকা টলিউডের এক চরম অপেশাদার ও বিতর্কিত দিকও এই সাক্ষাৎকারে অকপটে ফাঁস করেছেন অভিনেত্রী। অনুসূয়া জানান, কেরিয়ারের শুরুর দিকে তো বটেই, এমনকি আজকের দিনেও অনেক সময় বড় প্রজেক্টে কাজ সম্পূর্ণ পাকা হয়ে যাওয়ার পরও তাঁকে আর কোনো খবর দেওয়া হয় না। ফোন বা মেসেজ না করে হুট করে কোনো চরিত্র থেকে তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে নেওয়া হয়েছে, এমন অভিজ্ঞতা তাঁর বহুবার হয়েছে। এমনকি শুটিং শেষ করার পর স্টুডিওকে না জানিয়েই অন্য কাউকে দিয়ে ওঁর চরিত্রের ডাবিং করিয়ে নেওয়ার মতো চরম অপমানজনক ঘটনাও ঘটেছে। ইন্ডাস্ট্রির ভেতরে চলা এই লবিইজম বা অপেশাদার আচরণ নিয়ে তাঁর এই বিস্ফোরক স্বীকারোক্তি টলিউডের কাস্টিং ডিরেক্টর ও প্রযোজকদের ভূমিকা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রির এই নেতিবাচক মানসিকতার পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের আচরণ এবং বদলে যাওয়া সংস্কৃতি নিয়েও একটি সূক্ষ্ম বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন তিনি। অনুসূয়া আক্ষেপের সুরে জানান, আজকের দিনে নতুন ছেলেমেয়েরা ফ্লোরে এসেই নিজেদের জন্য আলাদা আলাদা মেকআপ রুম বা ভ্যানিটি ভ্যানের দাবি জানায়। অথচ সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় বা মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিরা আজও সবার সাথে একসাথে একই মেকআপ রুমে বসে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। একাকীত্বের এই নতুন সংস্কৃতি আসলে অভিনয়ের আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক আন্তরিকতাকে নষ্ট করছে বলে তিনি মনে করেন। একই সাথে মুম্বাইয়ের কাস্টিং কালচার নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। কেরিয়ারের এই পর্যায়ে এসেও যখন কোনো বড় হিন্দি প্রজেক্টের জন্য ওঁর ব্যাকগ্রাউন্ড না জেনেই অডিশন চাওয়া হয়, কিংবা অডিশন ভালো হওয়ার পরও মুম্বাইয়ের কাস্টিং টিম রহস্যজনক নীরবতা পালন করে, তখন এই গোটা ব্যবস্থার অসাড়তাই প্রকাশ পায়।
আরও পড়ুনঃ ‘বিপদের দিনে তাকে মানুষের পাশে দেখা গেলে ভালো হতো…’ ‘এত লোক গ্রেফতার হচ্ছে তাই হয়তো মন খারাপ!’ ধসে পড়ছে তৃণমূল! উধাও দেব! অভিনেতার রাজনৈতিক দূরত্ব নিয়ে কী বললেন রুদ্রনীল ঘোষ?
সব মিলিয়ে অনুসূয়া মজুমদারের এই সাক্ষাৎকারটি কেবলই একটি সাধারণ আলাপচারিতা নয়, বরং বিনোদন জগতের ভেতরের আলো-আঁধারির এক জীবন্ত দলিল। জীবনের বহু চড়াই-উতরাই, কাজের ক্ষেত্রে রাজনীতি বা অপ্রাপ্তির মুখোমুখি হয়েও তিনি যেভাবে নিজেকে ডিটাচড বা নির্লিপ্ত রাখতে শিখেছেন, তা সত্যিই শিক্ষণীয়। কেরিয়ারের শেষলগ্নে এসে আজও সত্যজিৎ রায়ের সাথে তাঁর নিয়মিত চিঠিপত্রের আদান-প্রদানের স্মৃতি রোমন্থন করেন তিনি, যা যেকোনো সিনে-প্রেমীর কাছে পরম প্রাপ্তি। টলিউডের এই নোংরা রাজনীতির শিকার হয়েও তিনি যেভাবে কোনো ক্ষোভ না রেখে নিজের কাজ দিয়ে জবাব দিয়েছেন, তা প্রমাণ করে যে কেন অনসূয়া মজুমদার একজন সাধারণ অভিনেত্রীর চেয়ে অনেক বেশি একজন প্রকৃত ও শ্রদ্ধেয় শিল্পী।

