‘টাকায় সব মেলে না, সিনেমার থেকে থিয়েটার অনেক বেশি তৃপ্তির!’ ২৫ বছরের ক্যারিয়ারে প্রথমবার উইন্ডোজের মুখোমুখি রজতাভ দত্ত! বর্তমান ইন্ডাস্ট্রিকে কড়া বার্তা অভিনেতার!

টলিউড (Tollywood) তথা ভারতীয় অভিনয় জগতের অন্যতম বহুমুখী ও শক্তিশালী অভিনেতা রজতাভ দত্ত (Rajatava Dutta)। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত খলনায়ক, সিরিয়াস ক্যারেক্টার কিংবা নিখাদ কমেডি সব ধরনের চরিত্রেই তিনি নিজের অসামান্য দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে উঠে আসা এই জাত শিল্পী দীর্ঘ আড়াই দশকেরও বেশি সময় ধরে রূপোলি পর্দায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। শুধু বাংলা ছবিতেই নয়, নিজের অভিনয় দক্ষতার জোরে সাউথ এবং বলিউডের একাধিক প্রজেক্টেও তিনি সমানভাবে সফল। দর্শককে কখনো হাসানো, কখনো বা ভয় ধরানো চরিত্রের রূপ পরিবর্তনে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘ ২৫ বছরের গৌরবময় ক্যারিয়ারে টলিউডের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রযোজনা সংস্থা ‘উইন্ডোজ প্রডাকশন’-এর সঙ্গে এর আগে কখনো কাজ করা হয়ে ওঠেনি তাঁর। অবশেষে সেই খরা কাটতে চলেছে আসন্ন ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’।
সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই ছবি এবং তাঁর দীর্ঘ জার্নি নিয়ে খোলামেলা আলোচনায় মাতলেন রজতাভ দত্ত। তিনি জানান, ছবির পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ ৩৬ বছরের গভীর বন্ধুত্ব। অতীতে তাঁরা একসঙ্গে বহু থিয়েটার করেছেন। তাই শিবপ্রসাদ যখন তাঁকে এই ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন, রজতাভ চিত্রনাট্য বা অন্য কোনো কিছু না শুনেই একবাক্যে রাজি হয়ে যান। উইন্ডোজ প্রডাকশনের সঙ্গে তাঁর প্রথম কাজ হওয়ায় নিজের মধ্যে একটা বাড়তি আগ্রহ ও উত্তেজনা ছিল। ছবিতে তিনি ‘বাল্মীকি ঘড়াই’ নামক এক পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় করছেন। জমিদার বাড়িতে ঘটে যাওয়া একটি রহস্যময় খুনের মামলার তদন্তে দেখা যাবে তাঁকে। অভিনেতা জানান, এটি একটি জমজমাট মার্ডার মিস্ট্রি বা রহস্যকাহিনী হলেও, তাঁর চরিত্রটিতে কমেডি এবং হিউমারের একটি বড় স্পেস রয়েছে, যা পুরো টানটান উত্তেজনার মাঝে দর্শকদের বাড়তি বিনোদন দেবে।
সাক্ষাৎকারে রজতাভ দত্ত তাঁর সমকালীন অভিনয় জীবনের বিবর্তন এবং বদলে যাওয়া প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়েও অত্যন্ত স্পষ্ট ও খোলামেলা মতামত প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আগে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ৮ ঘণ্টার নিয়মতান্ত্রিক শিফট হতো, যা এখন বেড়ে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকেছে। এর ফলে শিল্পীদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্দায় ফুটে ওঠে, যা সামগ্রিক ক্রিয়েটিভিটির ক্ষতি করে। প্রযুক্তির রূপান্তর নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি ভারতের প্রথম ডিজিটাল ছবি ‘নীল নির্জনে’ (যেখানে তিনি নিজে অভিনয় করেছিলেন) ছবির স্মৃতি মনে করান। তিনি জানান, আগে রিল বা র-স্টকে কাজ হতো বলে পরিচালকেরা অত্যন্ত মাপা এবং সুনির্দিষ্ট শট নিতেন। কিন্তু এখন ডিজিটাল ফরমেট আসার কারণে একই দৃশ্য ৪-৫টি ভিন্ন লেন্স এবং অ্যাঙ্গেল থেকে ১০ বার পর্যন্ত নেওয়া হয়। এতে এডিটিং টেবিলে অনেক কাট পেলেও অভিনেতা আসলে রোবট নন যে প্রতিটা শটেই একইরকম শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখবেন। এই মাল্টিপল ক্যামেরার সংস্কৃতির কারণে এডিট টেবিলে অনেক সময় অভিনেতার সেরা পারফরম্যান্সটি বাদ পড়ে যায়, যা শিল্পীদের মধ্যে এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতা বা ‘ইনসিকিউরিটি’ তৈরি করে।
সিনেমা মাধ্যমের পাশাপাশি থিয়েটার বা নাটকের প্রতি নিজের আজীবন ভালোবাসার কথাও পুনরায় ব্যক্ত করেছেন এই প্রবীণ অভিনেতা। তাঁর মতে, থিয়েটার হলো অভিনেতাদের জন্য এক গভীর আত্মতৃপ্তি ও লোভের জায়গা। সিনেমায় একজন অভিনেতা মূলত পরিচালকের মিডিয়ামের অংশ এবং এডিট টেবিলের ওপর নির্ভরশীল; সেখানে নিজের পছন্দের কোনো সূক্ষ্ম ম্যানারিজম বা অভিনয় এডিটের কাঁচিতে বাদ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু থিয়েটারের মঞ্চ সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে যতক্ষণ না পর্দা পড়ছে, অভিনেতাকে বাইপাস বা এডিট করার কোনো সুযোগ কারও থাকে না। দর্শক ও অভিনেতার মধ্যবর্তী সংযোগটি সেখানে সম্পূর্ণ এবং সরাসরি। কাজের শত ব্যস্ততা ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সামলেও যাঁরা থিয়েটার করেন, তাঁরা মূলত এই অবাধ স্বাধীনতার আনন্দ ও মঞ্চের রসদের টানেই ফিরে আসেন বলে তিনি মনে করেন।
আরও পড়ুন: ‘কিচ্ছু ভুলিনি, কে কখন পাল্টি খাচ্ছেন সব বুঝছি!’ ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর চুপ করে থাকাই টলিউডের সর্বনাশ করেছে!’ সাক্ষাৎকারে একের পর এক পর্দা ফাঁস করলেন রুদ্রনীল ঘোষ!
আগামী ২৯শে মে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতে চলেছে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালিত উইন্ডোজের রজতজয়ন্তী বর্ষের ২৫তম চলচ্চিত্র ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’। ছবিতে রজতাভ দত্ত ছাড়াও অভিনয় করেছেন সোহিনী সেনগুপ্ত, রাইমা সেন, অর্জুন চক্রবর্তী, সাহেব ভট্টাচার্য, ঋষভ বসু এবং অনামিকা সাহার মতো একঝাঁক চেনা মুখ। ছবির আবহ সংগীতে রয়েছেন জয় সরকার এবং গান লিখেছেন শ্রীজাত। সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষে বক্স অফিস বা হলের দর্শক সংখ্যা নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে অত্যন্ত চমৎকার জবাব দেন অভিনেতা। তিনি বলেন, “এই প্রশ্নটা শুনলেই মনে হয় আমি সিনেমা নয়, গুঁড়ো সাবান বেচতে বেরিয়েছি যে বলব কেন আমার সাবান সেরা!” তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, কোনো ছবিকে সফল করতে হলে বাড়তি কিছু নয়, বরং গল্প বলার ধরণটাই আসল। উইন্ডোজ অত্যন্ত সুন্দর এবং খাঁটি বাঙালিআনায় মোড়া একটি গল্প বুনেছে। তাই সব বিতর্ক পাশে সরিয়ে আগামী ২৯শে মে সিনেমা হলে গিয়ে এই দুর্দান্ত রহস্যের স্বাদ উপভোগ করার জন্য দর্শকদের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

