‘অনর্গল মিথ্যা বলার সাহস আমার…’ আমি অত্যন্ত মুখচোরা ও লাজুক!’ রাজনীতি করার কোন কোন গুণ নেই অভিনেতার মধ্যে? নিজের চরিত্রের আসল দিকটি মেলে ধরলেন কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়!

টলিউড (Tollywood) তথা বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম পরিচিত ও অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ অভিনেতা কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় (Koushik Banerjee)। কিংবদন্তি অভিনেতা হরধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুত্র কৌশিক আশির দশকের শুরুতে রুপোলি পর্দায় পা রাখেন। ১৯৮০ সালে দিনেন গুপ্তের ‘প্রিয়তমা’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করার পর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি একশোরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৪ সালে অজয় কর পরিচালিত ‘বিষবৃক্ষ’ চলচ্চিত্রে দেবেন্দ্র চরিত্রে তাঁর খলনায়কোচিত অভিনয় দর্শকদের মনে গভীর দাগ কাটে। এরপর থেকে বহু বাণিজ্যিক ও সমান্তরাল ধারার চলচ্চিত্রে ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় চরিত্রেই তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। অপর্ণা সেনের ‘পারমিতার এক দিন’ থেকে শুরু করে ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘শুভ মহুরত’ বা ‘চিত্রাঙ্গদা’-র মতো চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ আজও প্রশংসিত। সম্প্রতি ইউটিউব চ্যানেলে তাঁর একটি আসন্ন পডকাস্টের প্রোমো বা ঝলক মুক্তি পেয়েছে, যা ইতিমধ্যে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আসন্ন এই পডকাস্টের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দর্শন ও টলিউড ইন্ডাস্ট্রির অন্দরের সমীকরণ নিয়ে সোজাসাপ্টা মন্তব্য। প্রবীণ এই অভিনেতা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করার জন্য যে ধরনের মানদণ্ড বা যোগ্যতার প্রয়োজন হয়, তার একটিও তিনি নিজের মধ্যে খুঁজে পান না। তাঁর মতে, রাজনীতি করতে গেলে যে অদম্য সাহস এবং অবলীলায় অনর্গল মিথ্যা কথা বলার ক্ষমতার প্রয়োজন, তা তাঁর স্বভাবের পরিপন্থী। নিজেকে অত্যন্ত ‘মুখচোরা ও লাজুক’ মানুষ হিসেবে দাবি করে তিনি বলেন যে, এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই তিনি কখনো রাজনীতির আঙিনায় পা রাখার কথা ভাবেননি। নিজের এই বৈশিষ্ট্যকে তিনি কোনো দুর্বলতা নয়, বরং সততার অংশ হিসেবেই দেখেন।
এই পডকাস্টে কৌশিকবাবু স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে গিয়েছেন বাংলা সিনেমার সোনালী দিনগুলোতে, যেখানে উঠে এসেছে প্রেক্ষাগৃহের সংস্কৃতি এবং নিজের অভিনয় জীবনের এক আশ্চর্য আত্মোপলব্ধি। একটা সময়ে কলকাতার বিখ্যাত ‘প্রাচী’ সিনেমা হলের টিকিট পর্যন্ত বাংলা হরফে ছাপা হতো এবং সিনেমাকে ঘিরে মানুষের আবেগ ছিল বাঁধভাঙা। কেরিয়ারের শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে তিনি অত্যন্ত সততার সাথে একটি বড় স্বীকারোক্তি করেছেন। তিনি জানান, তরুণ মজুমদারের কালজয়ী ছবি ‘দাদার কীর্তি’-তে তাপস পালের করা আইকনিক ‘কেদার’-এর চরিত্রটি যদি পরিচালক তাঁকে দিয়ে করাতেন, তবে নিশ্চিতভাবে ছবিটি ফ্লপ হতো। একজন প্রথম সারির অভিনেতার পক্ষে নিজের সীমাবদ্ধতা এবং অন্যের শ্রেষ্ঠত্বকে এভাবে প্রকাশ্যে কুর্নিশ জানানো সত্যিই বিরল।
বাংলা সিনেমার দুই ভিন্ন ধারা মেইনস্ট্রিম বা বাণিজ্যিক সিনেমা এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের মতো পরিচালকদের সমান্তরাল সিনেমা নিয়ে কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেছেন। প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের কাজের ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি ‘নির্মম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তাঁর মতে, নিজের শিল্পসৃষ্টি এবং সিনেমা বানানোর প্রক্রিয়ায় ঋতুপর্ণ ছিলেন আপসহীন ও কঠোর। পাশাপাশি, সমান্তরাল সিনেমা করলেও তিনি মেইনস্ট্রিম বাণিজ্যিক ছবিকে কখনোই ‘গার্বেজ’ বা আবর্জনা বলতে রাজি নন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, যতক্ষণ না সিঙ্গেল স্ক্রিন থিয়েটারের সাধারণ দর্শকরা হলের ভেতরে কোনো অভিনেতার এন্ট্রি দেখে সিটি মারছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ প্রকৃত অর্থে ‘স্টার’ বা তারকা হয়ে উঠতে পারেন না। সাধারণ মানুষের ভালোবাসাই যে তারকা তৈরির আসল চাবিকাঠি, তা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন: হয়ে গিয়েছে সমস্ত পরিকল্পনা! কবে মা হচ্ছেন শ্রুতি দাস? নিজেই জানালেন ‘জোয়ার ভাটা’র নিশা!
অভিনেতার কেরিয়ারের লড়াই এবং ইন্ডাস্ট্রির ‘লবিং কালচার’ বা দলবাজি নিয়ে তাঁর বিস্ফোরক মন্তব্য উঠে এসেছে। কৌশিকবাবু অকপটে জানিয়েছেন যে, ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য বা কাজ পাওয়ার উদ্দেশ্যে কার সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে, কার বাড়ি গিয়ে তোষামোদ করতে হবে এই ধরনের লাগাতার কোনো পরিকল্পনা বা ‘লবিং’ তিনি তাঁর দীর্ঘ চার দশকের কেরিয়ারে কখনো করেননি। কেরিয়ারের শুরুর দিনগুলোর প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে তিনি যেভাবে লড়াই করতে এবং তৈরি হতে দেখেছেন, সেই চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী থাকা কোনো মানুষ আজ আর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বেঁচে নেই বলেও তিনি দাবি করেন। কোনো রকম বাঁকা পথ অবলম্বন না করার কারণে তিনি নিজেকে বর্তমানের তথাকথিত ‘র মেটেরিয়াল’ বা ব্যবহারের উপযোগী উপাদান মনে করেন না। এই অকপট ও সাহসী সাক্ষাৎকারটি যে বাংলা বিনোদন জগতের অনেক চেনা সমীকরণকে নাড়িয়ে দেবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অভিনেতা কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আসন্ন পডকাস্টের এই প্রোমো ভিডিওটি দেখতে পারেন, যা থেকে এই সংবাদের তথ্যসমূহ নেওয়া হয়েছে এবং যেখানে তিনি নিজের ক্যারিয়ার ও টলিউড নিয়ে এই অকপট মন্তব্যগুলি করেছেন।

