‘সিনেমা বিনোদনের জায়গা, রাজনীতির নয়!’ ‘আমি কোনদিনও সিনেমায় রাজনীতি ঢোকাইনি…’ কেরিয়ারের ২০ বছর, রুপোলি পর্দায় কেন কখনও রাজনীতি আনেননি দাবি দেবের!

২০০৬ সালে ‘অগ্নিশপথ’ সিনেমার হাত ধরে বাংলা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছিলেন এক কৃশকায় তরুণ দীপক অধিকারী অর্থাৎ সকলের প্রিয় দেব (Dev Adhikari)। আজ, দুই দশক পেরিয়ে তিনি টলিউডের অবিসংবাদিত মেগাস্টার এবং অন্যতম সফল প্রযোজক ‘দেব’। বিগত ২০ বছরের দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘চ্যালেঞ্জ’, ‘আমাজন অভিযান’-এর মতো ব্লকবাস্টার যেমন, তেমনই প্রযোজক হিসেবে ‘টনিক’, ‘প্রজাপতি’ বা ‘প্রধান’-এর মতো ভিন্ন ধারার সামাজিক ছবি দিয়ে হলবিমুখ বাঙালিকে থিয়েটারে ফিরিয়েছেন। তবে এই দীর্ঘ পথচলায় অভিনেতার আরও একটি বড় পরিচয় তৈরি হয়েছিল তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের অন্যতম হেভিওয়েট সাংসদ ও জনপ্রিয় জননেতা। গ্ল্যামার দুনিয়া এবং রাজনীতির অলিন্দে সমান দক্ষতার সঙ্গে বিচরণ করা সত্ত্বেও, নিজের পেশাদার সত্ত্বাকে সবসময় এক অদ্ভুত নিরপেক্ষতায় মুড়ে রেখেছিলেন এই তারকা।

নিজের এই দুই ভিন্ন জীবন নিয়ে একাধিক সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত খোলামেলা বয়ান দিয়েছেন দেব। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, অভিনয় কেরিয়ারের এই দীর্ঘ সময়ে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত বা দলীয় রাজনৈতিক আদর্শকে কখনও তাঁর সিনেমার কাজের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি। দেবের কথায়, “প্রথম দিন থেকেই আমার কাছে খুব পরিষ্কার, সিনেমা এবং রাজনীতি আলাদা।” বিনোদন জগতকে তিনি রাজনীতির কলুষতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখার পক্ষপাতী। তিনি বরাবরই বিশ্বাস করেন, সিনেমা হল এমন একটি পবিত্র জায়গা যেখানে দর্শকরা কেবল বিনোদন পেতে এবং দৈনন্দিন ক্লান্তি ভুলে গল্প উপভোগ করতে আসেন। সেখানে পর্দার আড়ালে বা গল্পের ভাঁজে দলীয় এজেন্ডা বা রাজনৈতিক রঙ ঢুকিয়ে দেওয়া দর্শকদের আবেগের সঙ্গে অন্যায় করার শামিল।

অভিনেতা থেকে প্রযোজক হয়ে ওঠার পর দেবের এই অরাজনৈতিক ও পেশাদার মানসিকতা আরও বেশি করে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর কাস্টিং ও সহশিল্পীদের নির্বাচনে। টলিউডে যেখানে দলবদলের হাওয়া বা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে শিল্পীদের মেরুকরণ অত্যন্ত চেনা ছবি, সেখানে দেব হেঁটেছেন সম্পূর্ণ উল্টো পথে। তিনি একাধিকবার বলেছেন যে তাঁর ছবির জন্য একজন ভালো অভিনেতা প্রয়োজন, তিনি বাস্তব জীবনে কোন দল করেন বা কার কী রাজনৈতিক মতাদর্শ, তা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। এই সৌজন্যের রাজনীতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ দেখা গেছে তাঁর ‘প্রজাপতি’ সিনেমাটিতে, যেখানে তিনি বিরোধী শিবিরের অন্যতম বড় মুখ তথা প্রবীণ অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছিলেন এবং শুটিং ফ্লোরে বিন্দুমাত্র রাজনীতির আঁচ আসতে দেননি। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বামপন্থী ভাবধারার বর্ষীয়ান অভিনেতার সঙ্গেও তাঁর পর্দার রসায়ন বক্স অফিসে ইতিহাস তৈরি করেছে।

দেবের মতে, তাঁর কাছে রাজনীতির সংজ্ঞাটা একটু আলাদা; তিনি এটিকে মানুষের সেবা করার মাধ্যম হিসেবে দেখেন, কোনো “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” বা বিভাজনের রাজনীতিতে তিনি বিশ্বাসী নন। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি আক্ষেপের সুরে টলিউডের ‘ব্যান সংস্কৃতি’ বা নিষেধাজ্ঞার রাজনীতির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছেন। সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে কে কোন দল করছে, তার ভিত্তিতে কাজ পাওয়া বা না-পাওয়া নির্ধারণ হওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন। নিজের ছবির সেটে বা চিত্রনাট্যে তিনি কখনওই এমন কোনো উপাদান রাখেননি যা কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে বা অন্য কোনো আদর্শকে ছোট করে। নিজেকে বড় করার জন্য অন্যকে ছোট করার মানসিকতা যে তাঁর ডিকশনারিতে নেই, তা তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমেই বারবার প্রমাণ করেছেন।

আরও পড়ুনঃ ‘স্টুডিও চত্বরে ঘুরে বেড়াচ্ছে অতৃপ্ত আত্মা!’ ‘বহু চোখের জলের অভিশাপ রয়েছে এখানে…!’ ‘মানুষ অপমানিত হয়ে আ’ত্মহত্যা করতে গেছে…’ গঙ্গাজল ছিটিয়ে টলিউডে পরিবর্তনের ডাক পাপিয়া অধিকারীর!

সম্প্রতি তাঁর দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের রাজনৈতিক সফর এবং সাংসদ পদের অধ্যায় শেষ হওয়ার পর দেবের এই সিনেমা-কেন্দ্রিক ভাবনা আরও দৃঢ় হয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে সরাসরি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরত্ব বজায় রেখে এখন থেকে তিনি তাঁর কেরিয়ারের আদি ও আসল ক্ষেত্র অর্থাৎ অভিনয়েই সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে চান। নিজের দীর্ঘ ২০ বছরের এই কেরিয়ারকে ছুঁয়ে তিনি দর্শকদের আশ্বস্ত করেছেন যে রুপোলি পর্দায় তিনি যেভাবে এতদিন কেবল নিখাদ বিনোদন আর সুস্থ সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে এসেছেন, আগামী দিনেও তার কোনো ব্যতিক্রম হবে না। রাজনীতির ময়দানকে বিদায় জানালেও, পর্দার হিরো হিসেবে কোটি কোটি বাঙালির মনের মণিকোঠায় যে তিনি দলমত নির্বিশেষে রাজত্ব করে যাবেন, দেবের এই আপসহীন পেশাদারিত্বই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

Back to top button