‘যৌ’নকর্মীরও দামাদামি আর সম্মতির অধিকার থাকে, ডিরেক্টর যা খুশি করতে পারেন না!’ ‘সম্মতি ছাড়া ছোঁয়া যায় না একজন যৌ’নকর্মী কেও!’ দেবালয়ের কুৎসার বিরুদ্ধে মোক্ষম জবাব অঙ্কিতা চক্রবর্তীর!

টলিউডের (Tollywood) অন্দরমহলে আবারও এক বিস্ফোরক কাস্টিং কাউচ ও যৌন হেনস্থার অভিযোগ সামনে এসেছে। পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্যের (Debalay Bhattacharya) বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌন হেনস্থা ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করার মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন অভিনেত্রী অঙ্কিতা চক্রবর্তী (Ankita Chakraborty)। সম্প্রতি এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক বৈঠকে নিজের দীর্ঘদিনের চাপা ট্রমা ও যন্ত্রণার কথা উগরে দিয়ে টলিউড তথা বিনোদন দুনিয়ায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন তিনি। লকডাউন চলাকালীন একটি প্রজেক্টের সাকসেস পার্টির আড়ালে ঘটে যাওয়া এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বিস্তারিত জানিয়ে অভিনেত্রী ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত পরিচালকের বিরুদ্ধে কড়া আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং থানায় সিসি দাখিল করেছেন।
অভিনেত্রী জানান, ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল করোনা মহামারীর লকডাউন পর্বের ঠিক পরপরই। সেই সময়ে ঘরবন্দি অবস্থাতেই তাঁরা ‘পবিত্র পাপিজ’ নামের একটি ওয়েব সিরিজের শুটিং করেছিলেন, যার নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন দেবালয় ভট্টাচার্য। কাজ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর একটি ঘরোয়া সাকসেস পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। অঙ্কিতা জানান, দেবালয়ের সাথে তাঁর দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক এবং পারিবারিক যোগাযোগ থাকার কারণে তিনি সেখানে অত্যন্ত নিরাপদ বোধ করছিলেন এবং তাঁর কোনো রকম মানসিক জড়তা ছিল না। কিন্তু পার্টি যখন শেষের দিকে এবং অন্যান্য সদস্যরা একে একে বিদায় নিচ্ছিলেন, তখনই ঘটে সেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। দেবালয় ভট্টাচার্য আচমকা অঙ্কিতার হাত ধরে টানেন এবং সংলগ্ন একটি ঘরে নিয়ে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা দিয়ে তাঁর কাঁধ আটকে ধরেন। এরপর অভিনেত্রী কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরিচালক তাঁকে জোরপূর্বক চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন। ৫-৬ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরে অঙ্কিতা সর্বশক্তি দিয়ে পরিচালককে ধাক্কা মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।
তাৎক্ষণিক এই ঘটনা নিয়ে মুখ না খোলার পেছনে থাকা সামাজিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন অভিনেত্রী। অঙ্কিতা জানান, পূর্বপরিচিত হওয়ার কারণে তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন হয়তো অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে পরিচালক এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরলে নিশ্চয়ই ফোন করে ক্ষমা চেয়ে নেবেন। কিন্তু মাসের পর মাস কেটে গেলেও পরিচালকের তরফ থেকে কোনো অনুশোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনা আসেনি। সংবাদ সম্মেলনে নিজের চরিত্র নিয়ে ওঠা কুৎসা এবং স্লাটশেমিংয়ের বিরুদ্ধে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও সাহসী ভাষায় জবাব দেন অঙ্কিতা। তিনি প্রকাশ করেন যে, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পরিচালক দেবালয় ভট্টাচার্য ব্যাকস্টেজ পলিটিক্স শুরু করেছেন এবং ইন্ডাস্ট্রির এক সিনিয়র সহকর্মীর কাছে অঙ্কিতার চরিত্র নিয়ে নোংরা মন্তব্য করে নিজের দোষ ঢাকার চেষ্টা করেছেন। এর পাল্টা জবাবে অঙ্কিতা সাফ জানান, তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া হয় যে তাঁর চরিত্র খারাপ বা তিনি একজন যৌনকর্মী তাতেও কি কোনো পুরুষ তাঁর অসম্মতিতে তাঁকে স্পর্শ করার অধিকার পেয়ে যান? একজন যৌনকর্মীর পেশাতেও দামাদামি এবং সম্মতির একটি নির্দিষ্ট গণ্ডি থাকে, যেখানে সম্মতি মিললে তবেই কেউ কারো ঘরে যায়। ফলে, কারো চরিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বা স্লাটশেম করে কোনোভাবেই যৌন হেনস্থার মতো অপরাধকে লঘু করা যায় না। ইন্ডাস্ট্রিতে ১৯ বছর ধরে সততার সাথে কাজ করা অঙ্কিতা এই উদাহরণের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেন যে, নারীর সামাজিক অবস্থান বা চরিত্র যেমনই হোক না কেন, তাঁর ‘না’ বলার এবং নিজের শরীরের ওপর সম্মতির অধিকার সবার ওপরে, যা লঙ্ঘন করার অধিকার টলিউডের কোনো ক্ষমতাবান পরিচালকেরও নেই।
তবে দীর্ঘদিনের এই নীরবতা ভেঙে হঠাৎ সংবাদ সম্মেলন ডাকার পেছনে একটি সাম্প্রতিক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। অভিনেত্রী জানান, দেবালয় ভট্টাচার্য সম্প্রতি নিজের ফেসবুক ওয়ালে পেশাগত নৈতিকতা, ন্যায়নীতি ও আদর্শ নিয়ে একটি লম্বা পোস্ট দেন। একজন মলেস্টর বা হেনস্থাকারী যখন জনসমক্ষে নীতিগর্ভ কথা কপচান, তখন তা অঙ্কিতার ভেতরের পুরনো ট্রমাকে তীব্রভাবে ট্রিগার করে। অভিনেত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ভগবানের আশীর্বাদে আমি গত দেড় বছর ধরে একটি জাতীয় স্তরের টেলিভিশনে কাজ করেছি, যা আমাকে আর্থিক ও পেশাগতভাবে এতটাই স্বাবলম্বী করেছে যে আজ কাজ হারানোর ভয় আমার নেই। তাই এখন কেউ আর আমার দিকে ‘কাজ না পেয়ে এটেনশন খোঁজার’ আঙুল তুলতে পারবে না।” নিজের সিস্টেম ও মানসিকতা থেকে এই দীর্ঘদিনের জমাটবদ্ধ যন্ত্রণা ও ট্রমা ঝেড়ে ফেলতেই তিনি এই উপযুক্ত সময়ে মুখ খুলেছেন।
আরও পড়ুনঃ নিজের জীবন বাজি রেখে মিঠিকে উদ্ধার করল পল্লবী! সানির সব কুকর্ম সুপর্ণার সামনেই ফাঁস করল পল্লবী! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব
সংবাদ সম্মেলনের শেষ অংশে অঙ্কিতা এবং তাঁর সাথে উপস্থিত বক্তারা টলিউডের পরিকাঠামোগত খামতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁরা বলেন, টলিউড আসলে মুখে বড় ইন্ডাস্ট্রি হলেও কাজে এটি অত্যন্ত অসংগঠিত এবং নিয়মহীন একটি ক্ষেত্র, যেখানে কোনো কর্পোরেট পরিকাঠামো বা এইচআর (HR) বিভাগ নেই। ফলে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা কিছু প্রভাবশালী মানুষ নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখে এই ধরনের ‘সিরিয়াল অফেন্ডার’দের বছরের পর বছর ব্যাকআপ দিয়ে আড়াল করে রাখে। ১৯ বছর বয়স থেকে থিয়েটার ও ইন্ডাস্ট্রিতে লড়াই করা অঙ্কিতা জানান, তিনি নিজের জন্য কোনো বাড়তি মাইলেজ চান না, শুধু চান পরিচালক মিডিয়া ও সামাজিক মাধ্যমে নিজের অপরাধ স্বীকার করে প্রকাশ্যে লিখিত ক্ষমা চান। এর পাশাপাশি, যেসব নতুন ও ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া তরুণ-তরুণীরা প্রতিদিন ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে আসছেন, তাঁদের জন্য একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ কাজের পরিবেশ তৈরি করাই তাঁর এই প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য।

