‘প্রচার পিছু ২৫ লাখ! টাকার জন্যই এরা তৃণমূলে যায়…’ ‘কোয়েলের রাজনৈতিক বুদ্ধি নেই’ ‘দেবের ওসব থিওরি ভণ্ডামি!’ দেব-কোয়েলদের তীব্র আক্রমণ রূপালী ভট্টাচার্যের!

রূপোলি পর্দার চাকচিক্য আর গ্ল্যামারের আড়ালে বাংলা বিনোদন জগতের অন্দরমহল যে কতটা পচে গিয়েছে, তা আরও একবার প্রকাশ্যে এল। সম্প্রতি এক ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া একটি দীর্ঘ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে টলিউডের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে একরাশ ক্ষোভ ও যন্ত্রণা উগরে দিলেন অভিনেত্রী রূপালী ভট্টাচার্য (Rupali Bhattacharya)। তাঁর এই বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারটি ইতিমধ্যেই টলিউডের অন্দরে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সাক্ষাৎকারে রূপালী সরাসরি আঙুল তুলেছেন শুটিং ফ্লোরের চূড়ান্ত অব্যবস্থা, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য করা, আর্টিস্ট ফোরামের মেরুদণ্ডহীনতা এবং সর্বোপরি শাসকদলের একচ্ছত্র রাজনৈতিক আধিপত্যের দিকে। দীর্ঘ প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইন্ডাস্ট্রির এই পালাবদলকে খুব কাছ থেকে দেখা অভিনেত্রীর স্পষ্ট দাবি “অহংকারই পতনের মূল,” আর টলিউডের এই খোলস এবার ভাঙার সময় এসেছে।

সাক্ষাৎকারের শুরুতেই নিজের ক্যারিয়ারের একটি হাড়হিম করা অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন রূপালী। তিনি জানান, একটি জনপ্রিয় স্যাটেলাইট চ্যানেলের সুপারন্যাচারাল সিরিয়ালের শুটিং করতে গিয়ে পরিচালক ও প্রোডাকশন টিমের চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার শিকার হতে হয়েছিল তাঁকে। তিস্তা ও রঙ্গিত নদীর খরস্রোতা মোহনায়, সাঁতার না জানা সত্ত্বেও তাঁকে জলের তলায় একটি পাথরের খাঁজে পা আটকে টানা তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়েছিল। অথচ তখনো ক্যামেরাই সেট করা হয়নি। প্রতিবাদ করলে উল্টে কাজ হারানোর ভয় দেখানো হতো। এখানেই শেষ নয়, অন্য একটি দৃশ্যে হারনেসে ঝুলিয়ে পিঠের চামড়া ছড়ে যাওয়া অবস্থাতেও তাঁকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলিয়ে রেখে পরিচালক ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা ফ্লোর ছেড়ে চলে যান। রূপালীর অভিযোগ, তৎকালীন সময়ে এই ধরনের অমানবিক অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে হতো, কারণ রুখে দাঁড়ালেই অলিখিতভাবে ‘ব্যান’ বা কোণঠাসা করে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়ে গিয়েছিল টলিউডে।

ইন্ডাস্ট্রির এই রমরমা সংস্কৃতির পতনের জন্য ২০১১ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনকেই মূল অনুঘটক হিসেবে দায়ী করেছেন রূপালী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ২০১১ সালের পর থেকেই টলিউডে শাসকদলের নগ্ন হস্তক্ষেপ শুরু হয়। ২১শে জুলাই-এর মঞ্চে যাওয়া শিল্পী, পরিচালক ও প্রযোজকদের বাড়তি সুবিধা, কাজের নিশ্চয়তা এবং সরকারি ফান্ডের টোপ দেওয়া হতে থাকে। ফলস্বরূপ, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত ‘আটিস্ট ফোরাম’ ও ‘ফেডারেশন’ রাতারাতি রাজনৈতিক রঙে রঞ্জিত হয়ে পড়ে। রূপালীর বিস্ফোরক দাবি, একপর্যায়ে সিরিয়ালের চিত্রনাট্য কী হবে, তাও নবান্ন বা শাসকদলের ঘনিষ্ঠ মহল থেকে ঠিক করে দেওয়া হতো। এমনকি রাজ্যে ঘটে যাওয়া কোনো নেতিবাচক ঘটনা সিরিয়ালে দেখানো যাবে না এমন রাজনৈতিক সেন্সরশিপের কারণে পুরো ট্র্যাক রিশুট করতে বাধ্য করা হয়েছিল। পাশাপাশি, সিরিয়ালের পর্ব বাড়িয়ে বেশি টাকা আয়ের জন্য চিত্রনাট্যকারদের ‘কাটমানি’ বা আন্ডার দ্য টেবিল ঘুষ দেওয়ার মতো চরম দুর্নীতিও গ্রাস করেছে এই মাধ্যমকে।

আরও পড়ুন: শ্রীনিবাস রাজি হলেও, বিয়ের প্রস্তাবে রাজি নয় ঝিনুক! সময় চেয়ে কি বড় কোনো বিপদ এড়াতে পারবে সে? দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

টলিউডের প্রথম সারির তারকাদের সুবিধাবাদী রাজনীতি ও দলবদল নিয়েও তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন এই অভিনেত্রী। দেব, মিমি কিংবা নুসরাতের মতো তারকাদের ‘রাজনীতির অবুঝ শিশু’ সেজে থাকার নাটককে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি বলেন, শাসকদলের নির্বাচনী প্রচারে যাওয়ার জন্য অভিনেত্রীদের এক-একটি সভার জন্য ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হতো। সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা এভাবেই অপচয় করা হয়েছে। দেবের বারবার নির্বাচনে দাঁড়ানো এবং পরে ‘বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছি’ বলাটা এক চরম ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে, কোয়েল মল্লিককে রাজ্যসভায় পাঠানোর জল্পনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোয়েল ভালো মা, ভালো মেয়ে বা ভালো অভিনেত্রী হতে পারেন, কিন্তু তাঁর কোনো রাজনৈতিক মেধা বা স্পষ্ট আদর্শ কোনোদিন দেখা যায়নি। রূপালীর আক্ষেপ, যারা এতদিন ক্ষমতার মধু খেয়ে কোটি কোটি টাকার বৈভব ও লাইফস্টাইল বানিয়েছেন, পরিস্থিতি বেগতিক দেখেই তাঁরা এখন রাতারাতি ‘টাক্সিডো’ বা দল পরিবর্তন করে গেরুয়া শিবিরে ঢুকে সাধু সাজার চেষ্টা করছেন।

সাক্ষাৎকারের শেষে ইন্ডাস্ট্রির জালিয়াতি এবং নিজের লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন রূপালী। তিনি জানান, সিনেমা সুপারহিট দেখানোর জন্য আজকাল ‘কর্পোরেট বুকিং’-এর এক ভুয়ো খেলা চলছে। প্রযোজকরা নিজেরাই মোটা টাকায় হল বুকিং করে সেই ফ্রি টিকিট গ্রামেগঞ্জে দলীয় কর্মীদের মধ্যে বিলিয়ে দেন হল ভরানোর জন্য, যা তিনি নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন। এই সিন্ডিকেট ও লবির বাইরে থাকার অপরাধে রূপালী গত ১০ বছরে প্রায় কোনো কাজই পাননি। তবে প্রমিয়ারের আমন্ত্রণ না পেলেও নিজের পকেটের পয়সায় টিকিট কেটে তিনি প্রতি সপ্তাহে সিনেমা দেখেন, যাতে বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে হলেও তাঁর অভিনয়ের ফর্ম নষ্ট না হয়। তবে দীর্ঘদিনের এই অন্ধকারের পর টলিউডে আবার একটা নতুন সূর্য ওঠার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। যেখানে প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি বা রূপা গাঙ্গুলীদের তৈরি করা পুরোনো গৌরবময়, অরাজনৈতিক ও সুস্থ কর্মসংস্কৃতি আবার ফিরে আসবে এবং শিল্পীরা ‘অর্ডার সাপ্লাই’ বা দাসের মতো নয়, বরং সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন।

Back to top button