‘বাবার হাত ধরে ডিরেক্টর হলেন, অথচ আমাদের দুই বোনকেই কাজ থেকে বঞ্চিত করলেন!’ টলিউডের ‘অকৃতজ্ঞতা’ নিয়ে মুখ খুললেন রিনা চৌধুরী!

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও সংলাপের জাদুকর অঞ্জন চৌধুরীর (Anjan Chowdhury) কনিষ্ঠ কন্যা রিনা চৌধুরী (Rina Chowdhury) বাংলা বিনোদন জগতের এক অত্যন্ত পরিচিত এবং বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। পারিবারিক আবহে ছোটবেলা থেকেই সিনেমার সান্নিধ্যে বড় হওয়া রিনা চৌধুরীর অভিনয়ে অভিষেক ঘটেছিল ১৯৮৪ সালের ইতিহাস সৃষ্টিকারী ‘শত্রু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, যেখানে তিনি অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বোনের একটি ছোট চরিত্রে ক্যামেরার গতিপ্রকৃতি না বুঝেই খেলার ছলে অভিনয় করেছিলেন। পরবর্তীতে পড়াশোনা শেষ করে তিনি পুরোদস্তুর অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন এবং অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে ‘গীত সংগীত’ চলচ্চিত্রে তাঁর অভিনয় ও কণ্ঠের বিখ্যাত গান “দরজা খুইলা দেখুম যারে করুম তারে বিয়া” আজও বাংলার জেলায় জেলায় মাচ শো বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দর্শকদের কাছে সমান জনপ্রিয়। রূপালী পর্দার পাশাপাশি যাত্রাজগতেও তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র; দীর্ঘ ২৪ বছর যাত্রামঞ্চ কাঁপানোর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও যাত্রা প্রহরীর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘নটী বিনোদিনী’ যাত্রায় তিনি নামভূমিকায় অভিনয় করে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন, যা তাঁর অভিনয় জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।
চলচ্চিত্রের এই বর্ণিল যাত্রাপথে রিনা চৌধুরী কাজ করেছেন অনিল চ্যাটার্জি, বিকাশ রায়, শুভেন্দু চ্যাটার্জি, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, অনুপ কুমার, রবি ঘোষ এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো টলিউডের স্বর্ণযুগের তাবড় তাবড় কিংবদন্তি শিল্পীদের সাথে। সাক্ষাৎকারে তিনি সেই সময়কার এক সোনালী এবং নিয়মানুবর্তী অধ্যায়ের কথা স্মরণ করেন, যেখানে বড় তারকাদের প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা এবং সেটে থাকত কঠোর অনুশাসন। ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান যে, তৎকালীন খলনায়ক জীবন কৃষ্ণ কীর্তনীয়াকে তিনি বাস্তব জীবনে গুন্ডা ভেবে ভীষণ ভয় পেতেন এবং বাবার পেছনে লুকিয়ে পড়তেন, যদিও পরবর্তীতে ‘আব্বাজান’ চলচ্চিত্রে কাজ করার সময় সেই ভুল ভেঙেছিল এবং বুঝতে পেরেছিলেন তিনি কতখানি অমায়িক মানুষ ছিলেন। এছাড়া সহ-অভিনেতা অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের অকালপ্রয়াণ এবং কাজ থেকে বাদ পড়া জনিত ক্ষোভের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, কর্মক্ষেত্রে তাঁরা সবসময় পেশাদারিত্ব বজায় রাখতেন এবং সেটের বাইরে কারোর ব্যক্তিগত মান-অভিমান নিয়ে মাথা ঘামাতেন না।
টলিউড ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের কিছু অলিখিত সত্য এবং প্রচ্ছন্ন অভিমানও এই আলোচনায় উঠে এসেছে। রিনা চৌধুরী জানান যে, তাঁর পিতা অঞ্জন চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত উদার মনের মানুষ, যিনি নিজের বহু সহকারীকে পরবর্তীতে স্বাধীন পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করেছিলেন। তবে আক্ষেপের বিষয় হলো, সেই পরিচালকেরা পরবর্তীতে স্বাবলম্বী হয়ে অঞ্জন চৌধুরীর দুই মেয়ে চুমকি চৌধুরী বা রিনা চৌধুরীকে তাঁদের সিনেমায় কাস্ট করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এই বিষয়ে কিছুটা প্রচ্ছন্ন আক্ষেপ থাকলেও রিনা চৌধুরী স্পষ্ট জানান যে, বাবার দেওয়া শিক্ষা ও আত্মসম্মানকে বিসর্জন দিয়ে তাঁরা কখনো কারো কাছে কাজ চাইতে যাননি। অবশ্য টলিউডের অন্যতম সফল পরিচালক সুজিত গুহ-র প্রতি তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, যিনি অঞ্জন চৌধুরীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকে রিনা চৌধুরীকে তাঁর প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে সুযোগ দিয়েছিলেন।
অভিনয়ের পাঠ চুকিয়ে রিনা চৌধুরী এখন মূলত ব্যস্ত রয়েছেন গল্প লেখা, চিত্রনাট্য তৈরি এবং চলচ্চিত্র পরিচালনায়। বাবার মতো তিনিও কোনো পরিচালকের সহকারী না হয়ে সরাসরি স্বাধীন পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং ইতিমধ্যে তিনটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি ‘কল্পতরু’ মর্যাদাপূর্ণ ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল। এরপর তিনি নির্মাণ করেন সাহেব চ্যাটার্জি ও বিদিশা অভিনীত ‘ছায়া সূর্য’ এবং অতি সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে তরুণ কুমারের নাতি সৌরভ ও নবাগতা রিয়া অভিনীত চলচ্চিত্র ‘সোহাগ রাত’। এখানেই শেষ নয়, রিনা চৌধুরী এবং তাঁর দিদি চুমকি চৌধুরীর একটি যৌথ ‘ড্রিম প্রজেক্ট’ রয়েছে। অঞ্জন চৌধুরীর লেখা ‘পাখি’ নামক একটি ঐতিহাসিক ও অপ্রকাশিত চিত্রনাট্য তাঁদের কাছে সংরক্ষিত আছে, যা একসময় মহানায়ক উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনকে নিয়ে তৈরি করার কথা উঠেছিল এবং স্বয়ং মহানায়ক চিত্রনাট্যটি অত্যন্ত পছন্দ করেছিলেন; ভবিষ্যতে এই গল্পটিকে সেলুলয়েডের পর্দায় ফিরিয়ে আনার দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি।
আরও পড়ুনঃ চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মৃ’ত্যু! মাত্র ৩১ বছর বয়সে না ফেরার দেশে অভিনেত্রী তথা জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটার!
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে রিনা চৌধুরী বর্তমান সমাজ, প্রযুক্তির আগ্রাসন এবং বাংলা সিনেমার বিবর্তন নিয়ে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রজন্ম স্মার্টফোনে অতিরিক্ত আসক্তির কারণে বাস্তব পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে এবং এর ফলে মানুষের সামগ্রিক ধৈর্যের চ্যুতি ঘটছে; যেখানে আগে মানুষ সাড়ে তিন ঘণ্টার সিনেমা বা যাত্রা দেখত, সেখানে এখন আড়াই ঘণ্টার ছবি দেখতেও দর্শক হাঁপিয়ে ওঠে। একই সাথে বর্তমান যুগের বাংলা সিনেমায় অবাঙালি সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন যে, পাঞ্জাবি বা মারাঠি ছবিতে যেমন কখনো বাঙালির প্রথা দেখানো হয় না, তেমনি বাংলা সিনেমাতেও মেহেন্দি বা সংগীতের মতো ভিনরাজ্যের সংস্কৃতি বাদ দিয়ে খাঁটি ‘বাঙালি আনা’ যেমন— গায়ে হলুদ বা বাসর ঘরের মতো নিজস্ব ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা উচিত, তবেই দর্শক আবার নিজের তাগিদে সিনেমা হলে ফিরবে।

