‘আমি ‘চটিচাটা’ হলে আজ…’ ‘বাবার ওপর পুলিশের অকথ্য নির্যাতন দেখেছি…’ ‘আগে দেখান আমি কোন রঙের তলায় ছিলাম!’ ট্রোলারদের কড়া জবাব অভিনেত্রী মৈত্রেয়ী মিত্রর!

টলিউড (Tollywood) এবং বাংলা টেলিভিশন জগতের অত্যন্ত পরিচিত ও দাপুটে অভিনেত্রী মৈত্রেয়ী মিত্র (Maitryee Mitra)। কয়েক দশক ধরে তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত অসংখ্য জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল এবং চলচ্চিত্রে তাকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি মৈত্রেয়ী তার স্পষ্টবাদিতা এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য পরিচিত। পেশাগত জীবনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই অভিনেত্রী সবসময়ই লাইমলাইটের চেয়ে নিজের কাজকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবনের কঠিন সময়, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সামাজিক মাধ্যমে তাকে নিয়ে চলা বিতর্কের বিষয়ে অত্যন্ত সাহসী ও বাস্তবসম্মত কিছু মন্তব্য করেছেন, যা নতুন করে চর্চার জন্ম দিয়েছে।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পুরনো ছবি পোস্ট করা এবং তাকে উদ্দেশ্য করে খোলা চিঠি লেখায় মৈত্রেয়ীকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। নেটিজেনদের একাংশ তাকে ‘চটিচাটা’ বা ‘গিরগিটি’র মতো কুরুচিকর বিশেষণে আক্রমণ করেছেন। এই বিষয়ে অভিনেত্রী সাফ জানান যে, ২০১১ সালে রাজ্যে যখন পরিবর্তন এসেছিল, তখন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে তিনি নতুন স্বপ্নের আশায় বুক বেঁধেছিলেন। সেই আবেগ থেকেই তিনি পোস্টটি করেছিলেন। তার মতে, কারো সমালোচনা করা বা শ্রদ্ধা জানানো মানেই তার ‘তাবেদারি’ করা নয়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে, যারা তাকে আজ রং বদলানোর কথা বলছেন, তারা আগে প্রমাণ করে দেখান যে তিনি আগে কোন রঙের তলায় ছিলেন।
মৈত্রেয়ী মিত্র তার পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস তুলে ধরে জানান যে, তিনি কোনো অরাজনৈতিক পরিবেশ থেকে আসেননি। তার বাবা সক্রিয়ভাবে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেই সময় ভয়াবহ পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। এমনকি তার কাকাও বামপন্থী রাজনীতির সমর্থক ছিলেন। নিজের বাড়িতেই তিনি বিভিন্ন মতাদর্শের মেলবন্ধন দেখে বড় হয়েছেন। ২০০৭ সাল থেকেই তার কাছে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার একাধিক প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু তার বাবা তাকে সেই পথ থেকে দূরে রেখেছিলেন কারণ মৈত্রেয়ী মনে করেন তিনি রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের মানুষ নন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলেই তিনি দীর্ঘ সময় পর মুখ খুলেছেন এবং ভবিষ্যতে ভুল দেখলে তিনি যেকোনো দলেরই সমালোচনা করবেন।
বর্তমান সময়ে বিনোদন জগতের শিল্পীদের প্রতি সাধারণ মানুষের অবমাননাকর মনোভাব নিয়ে মৈত্রেয়ী এক গভীর আত্মোপলব্ধির কথা জানান। তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতির জন্য শিল্পীদেরও কিছুটা দায় রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে অনেক শিল্পীই তাদের ব্যক্তিগত জীবনের খুঁটিনাটি মানুষের সামনে এতটাই উন্মুক্ত করে দিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের কাছে তাদের ‘সহজলভ্য’ মনে হতে শুরু করেছে। এই অতিরিক্ত প্রচারের ফলে শিল্পীদের প্রতি সেই আগেকার সমীহ বা শ্রদ্ধা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। মৈত্রেয়ীর মতে, প্রত্যেকের জীবনেই একটি ‘বর্ডারলাইন’ থাকা উচিত। শিল্পীরা যদি নিজেদের সম্মান বজায় রাখতে না পারেন, তবে জনতার কাছ থেকে সম্মান আশা করা কঠিন।3
আরও পড়ুনঃ বিনোদন জগতে বিরাট দুঃসংবাদ! ফেরা হলো না বাড়ি! আচমকা অসুস্থ হয়ে প্রয়াত অভিনেতা! মাত্র ৪৭ বছর বয়সেই না ফেরার দেশে হারিয়ে গেলেন অভিনেতা!
সাক্ষাৎকারের শেষে অভিনেত্রী তার জীবনের এক চরম সত্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় না থাকার কারণে তাকে টানা ২৬ মাস কাজের অভাবে বসে থাকতে হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যদি তিনি কোনো বিশেষ দলের দালালি বা ‘চটিচাটা’ হতেন, তবে তাকে এত দীর্ঘ সময় কর্মহীন থাকতে হতো না এবং আজ তার একাধিক ফ্ল্যাট বা দামী গাড়ি থাকত। মধ্যবিত্ত জীবনযাপনে অভ্যস্ত মৈত্রেয়ী জানান, তিনি মাধ্যমিক দেওয়ার পর থেকেই টিউশন করে নিজের ও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তার চাওয়া অত্যন্ত সাধারণ—তিনি কেবল সম্মানের সঙ্গে কাজ করে দুবেলা শান্তিতে খেয়ে-পরে বাঁচতে চান, কোনো রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বা অনৈতিক সুবিধা তার কাম্য নয়।

