‘শিক্ষিত না হলে ভালো অভিনেতা হওয়া যায় না!’ ‘গর্ব করে বলতে পারি অভিনয় জগতে আমার রক্ত…!’ অভিনয় থেকে জীবন দর্শন! জীবনের না বলা কথা নিয়ে অকপটে ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়ের!

বাংলা বিনোদন জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং থিয়েটার ও পর্দার শক্তিশালী অভিনেতা ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায় (Phalguni Chatterjee)। কয়েক দশক ধরে তিনি মঞ্চ, ছোট পর্দা এবং সিনেমা তিন মাধ্যমেই নিজের অভিনয়ের ছাপ রেখে চলেছেন। তবে তাঁর পরিচয় কেবল একজন অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ থিয়েটার কর্মী ও নির্দেশক। দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই শিল্পী থিয়েটার দল ‘লোককৃষ্টি’-র মাধ্যমে বাংলা নাট্যজগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারের নানা চড়াই-উতরাই, অভিনয়ের গূঢ় দর্শন এবং ব্যক্তিগত জীবনের মজাদার ও অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী ভাগ করে নিয়েছেন, যা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে এক বড় পাওনা।

অভিনয় জীবনের মূল ভিত্তি হিসেবে ফাল্গুনী বাবু সবসময় শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, একজন প্রকৃত অভিনেতা হতে গেলে কেবল প্রতিভা থাকলেই চলে না, প্রয়োজন গভীর পড়াশোনা ও জীবনবোধ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো অশিক্ষিত মানুষ প্রকৃত অর্থে বড় মাপের অভিনেতা হতে পারেন না। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, কলেজ জীবনে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যপাঠ তাঁর ভেতরের কাল্পনিক জগতকে প্রসারিত করেছিল। এই পড়াশোনার অভ্যাসই তাঁকে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বুঝতে এবং মঞ্চে সেই চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলতে সাহায্য করেছে। তিনি মনে করেন, আজকের অভিনেতা-অভিনেত্রীদেরও নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস বজায় রাখা উচিত যাতে তাদের অভিনয় আরও গভীর ও অর্থবহ হয়।

থিয়েটার এবং সিনেমার পার্থক্য নিয়ে ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়ের নিজস্ব এক দর্শন রয়েছে। তিনি থিয়েটারকে তাঁর ‘প্রথম ভালোবাসা’ এবং নিজস্ব স্বাধীনতা প্রকাশের জায়গা হিসেবে দেখেন। তাঁর মতে, মঞ্চে অভিনেতা নিজের ভাবনায় কথা বলতে পারেন এবং সরাসরি দর্শকের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন। অন্যদিকে, সিরিয়াল বা সিনেমার কাজ হলো অন্যের ভাবনাকে রূপ দেওয়া, যেখানে অভিনেতাকে পরিচালকের পরাধীনতায় থেকে কাজ করতে হয়। যদিও তিনি বহু জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল এবং সিনেমায় অভিনয় করেছেন, তবুও তাঁর হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে আছে মঞ্চ। নাটকের প্রতি এই নিখাদ ভালোবাসাই তাঁকে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় বা বিভাস চক্রবর্তীর মতো কিংবদন্তিদের স্নেহভাজন করে তুলেছে।

ব্যক্তিগত জীবনে ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়ের নাম নিয়ে একটি কৌতুককর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইন্টারনেটে। নামের শেষে ‘দীর্ঘীকার’ থাকার কারণে গুগল বা উইকিপিডিয়ার মতো তথ্যের ভাণ্ডারে তাঁকে অনেক সময় ‘অভিনেত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বেশ কৌতুক বোধ করেন এবং জানান, নিজের পৌরুষ প্রমাণ করার জন্য তিনি কোনোদিন এই ভুল সংশোধন করার প্রয়োজন বোধ করেননি। একইসঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী রুমকি চট্টোপাধ্যায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রেসিডেন্সি কলেজের বাংলার ছাত্রী রুমকি দেবীকে বিয়ে করার পেছনেও ফাল্গুনী বাবুর একটি ‘হিসাব’ ছিল তিনি চেয়েছিলেন একজন শিক্ষিত জীবনসঙ্গিনী, যিনি পরিবারের এবং পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার ভিত মজবুত করবেন। আজ তাঁর সুখী পরিবার সেই সঠিক সিদ্ধান্তের প্রমাণ দেয়।

আরও পড়ুনঃ ‘তুমি যতই আমার থেকে ছোট হও না কেন, তোমাকে আমার কাজ করে দিতে হবে…’ তুমি আমার মেয়ের চরিত্রে অনেক অভিনয় করেছ, কিন্তু এইবার…’ সবাইকে ভালোবেসে সবার সাথে চলতে চান রূপা গাঙ্গুলী! সায়নী ঘোষকে নিয়ে কি বললেন অভিনেত্রী!

সবশেষে উঠে আসে তাঁর সুযোগ্য পুত্র, টলিউড সুপারস্টার আবির চট্টোপাধ্যায়ের কথা। ছেলের আকাশচুম্বী সাফল্য একজন পিতা হিসেবে ফাল্গুনী বাবুকে পূর্ণতা দেয়। তিনি জানান, আবিরও তাঁর মতোই পড়াশোনা এবং চলচ্চিত্রের ব্যাকরণ সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। আবির যখন মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন, তখন ফাল্গুনী বাবু তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। আজ যখন বড় পর্দায় আবিরকে দর্শক হাততালি দেয়, তখন তিনি নিজের অভিনয়ের ‘জিন’ বা রক্তের উত্তরাধিকার খুঁজে পান। ফাল্গুনী চট্টোপাধ্যায়ের এই জীবনকাহিনি আমাদের শেখায় যে, সততা, নিষ্ঠা এবং শিক্ষার মেলবন্ধন থাকলে যে কোনো শিল্প মাধ্যমেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা সম্ভব।

Back to top button