‘যখন রাগ হয়, তখন রাগই করি, জীবনের প্রতিটি ইমোশনকে তার যোগ্য জায়গা দি আমি!’ পাশে নেই রাহুল, কীভাবে নিজের ইমোশন কন্ট্রোল করছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার?

রূপালি পর্দার প্রেম যখন বাস্তবে ধরা দেয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তা রূপকথার মতো মনে হয়। রাহুল (Rahul Banerjee) এবং প্রিয়াঙ্কার (Priyanka Sarkar) গল্পটা শুরু হয়েছিল ঠিক সেভাবেই। ২০০৮ সালে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ ছবির হাত ধরে রাজ-কৃষ্ণার রসায়ন বাঙালির ড্রয়িংরুমে জায়গা করে নিয়েছিল। সেই প্রেমের টানেই বাস্তব জীবনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। কিন্তু দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পার করার পর, ব্যক্তিগত টানাপোড়েন আর আইনি লড়াইয়ের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে তাদের সেই সংসার ভেঙে গিয়েছিল। বিচ্ছেদ এবং দীর্ঘ কয়েক বছরের আইনি লড়াইয়ের পর গত দু-তিন বছর ধরে তারা আবার একে অপরের কাছাকাছি আসছিলেন। ছেলে সহজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তারা আবার একসঙ্গে পথচলা শুরু করেন। কিন্তু সেই সুখের অধ্যায় পূর্ণ হওয়ার আগেই এক আকস্মিক ট্র্যাজেডি ওলটপালট করে দিল প্রিয়াঙ্কার সাজানো জীবন।

গত ২৯ শে মার্চ ওড়িশার তালসারি সমুদ্রসৈকতে একটি শুটিং চলাকালীন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে তাঁর এই অকাল প্রয়াণ শুধু টলিউড নয়, আপামর চলচ্চিত্র প্রেমীদের স্তব্ধ করে দিয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্ট অনুযায়ী, শুটিং শেষ হওয়ার পর তিনি সমুদ্রে নামেন এবং সেখানেই তলিয়ে যান। সহকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনার পর স্টুডিও পাড়ায় শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয়াঙ্কা নিজে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিভাবকদের পাশে নিয়ে তালসারি থানায় এফআইআর দায়ের করেন এবং স্বামীর মৃত্যুর সঠিক তদন্ত দাবি করেন।

ব্যক্তিগত জীবনের এই চরম সংকটে প্রিয়াঙ্কা যেভাবে নিজেকে শান্ত রেখেছেন, তা অনেককেই অবাক করেছে। নিজের ইমোশনাল কন্ট্রোল বা আবেগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে প্রিয়াঙ্কা এক অনন্য দর্শনের কথা শুনিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিটি আবেগেরই নিজস্ব সময় এবং গুরুত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করি প্রতিটি ইমোশনকে তার প্রাপ্য জায়গা দিতে। যখন রাগ হয়, তখন আমি রাগ করি, যখন একা থাকা দরকার, তখন নিজেকে সময় দিই।” তিনি আরও জানান যে ‘ইনসাইড আউট’ সিনেমার মতো আমাদের ভেতরের আনন্দ, দুঃখ বা রাগ সবকটি সত্তাকেই গ্রহণ করা উচিত। আবেগকে চেপে না রেখে বরং সেটিকে প্রসেস করার মাধ্যমেই মানসিক শান্তি পাওয়া সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

স্বামীর মৃত্যুর পর সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে প্রিয়াঙ্কা তাঁর মনের আগল খুলেছেন। প্রিয়াঙ্কার কথায়, “সব কিছুর ঊর্ধ্বে রাহুল আমার ২১ বছরের বন্ধু ছিল। আমরা যখন একে অপরের সাথে লড়াই করতাম, তখনও আমাদের মধ্যে যোগাযোগ বা বই-সিনেমার আদানপ্রদান বন্ধ হয়নি।” প্রিয়াঙ্কা জানান যে তাঁর রুচি তৈরি করা থেকে শুরু করে অভিনয়ের খুঁটিনাটি সমালোচনা সবক্ষেত্রেই রাহুলের বড় ভূমিকা ছিল। তাঁর মতে, একজন কঠোর সমালোচক এবং ভরসার বন্ধু হিসেবে রাহুলের শূন্যস্থান কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। এই কঠিন সময়ে তাঁর ‘সাপোর্ট সিস্টেম’ বা বন্ধুরা যেভাবে তাঁর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন, তাতে তিনি অভিভূত।

রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার সম্পর্কের একমাত্র সেতুবন্ধন তাঁদের ছেলে সহজ। বিচ্ছেদের তিক্ততা কাটিয়ে তাঁরা আবারও এক হয়েছিলেন মূলত সহজের কথা ভেবেই। বাবার মৃত্যুর পর কিশোর সহজের জীবনে যে পাহাড়প্রমাণ শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা প্রিয়াঙ্কাকে একা হাতেই সামলাতে হচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছেন, সহজের কাছে রাহুল কেবল বাবা ছিলেন না, ছিলেন খেলার সাথিও। বাবার অভাব যাতে ছেলেকে কুঁকড়ে না দেয়, তার জন্য প্রিয়াঙ্কা এখন নিজের শোক সামলে পাহাড়ের মতো শক্ত হয়ে ছেলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এখন শুধুই সহজকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ আচমকা অসুস্থ পৌষালী ব্যানার্জি! রাতেই হাসপাতালে ভর্তি, গায়িকার শারীরিক অবস্থা নিয়ে কী জানাল পরিবার?

ব্যক্তিগত জীবনে এত বড় ঝড়ের মধ্যেও প্রিয়াঙ্কা লড়াই থামিয়ে দেননি। পেশাদার অভিনেত্রী হিসেবে তিনি আবারও কাজে ফিরেছেন। তাঁর আসন্ন ওয়েব সিরিজ ‘কুহেলি’র প্রচারের মাঝেও তিনি বারবার স্মরণ করেছেন রাহুলকে। প্রিয়াঙ্কা মনে করেন, কাজই মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয়, আর রাহুলও হয়তো চাইতেন তিনি কাজ দিয়েই ঘুরে দাঁড়ান। দর্শক ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেছেন, “এই কঠিন সময়ে ইন্ডাস্ট্রি এবং অনুরাগীরা যেভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, তা আমাকে বেঁচে থাকার রসদ জোগাচ্ছে।” ব্যক্তিগত শোক আর সহজের দায়িত্বকে কাঁধে নিয়ে প্রিয়াঙ্কা সরকার এখন এক নতুন যুদ্ধের পথে।

Back to top button