‘ছেলের স্কুলের মাইনে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না, পড়াশোনার খরচ চালাতে বাড়ি বন্ধক দিয়েছি’ আজকের সাফল্যের আড়ালে, অতীতের অজানা যন্ত্রণার কথা ভাগ করলেন গায়ক শিলাজিৎ মজুমদার !

বাংলা ব্যান্ড জগত বা সমকালীন আধুনিক গানে তিনি এক স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। তাঁর গান যেমন ছকভাঙা, যাপনও ঠিক ততটাই সাদামাটা অথচ দাপুটে। তিনি শিলাজিৎ মজুমদার (Silajit Majumder)। দশকের পর দশক ধরে তাঁর গায়কী ও অভিনয় দিয়ে তিনি দর্শকদের মুগ্ধ করে রেখেছেন। তবে খ্যাতির শিখরে পৌঁছানোর পথটা যে কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না, বরং বারবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে তাঁকে, সেই অজানা যন্ত্রণার কথা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অকপটে ভাগ করে নিলেন শিল্পী। তাঁর আসন্ন চলচ্চিত্র ‘প্রত্যাবর্তন’-এর মুক্তির প্রাক্কালে তিনি ব্যক্তিগত জীবনের এমন কিছু অধ্যায় তুলে ধরলেন, যা অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক।

জীবনের কঠিন বাস্তব কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, শিল্পী তা অনুভব করেছিলেন তাঁর বাবার মৃত্যুর ঠিক আগে। শিলাজিৎ জানান, তাঁর জীবনের এক চরম আর্থিক সংকটের কথা যখন তাঁর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স ছিল কার্যত শূন্য। বাবার চিকিৎসার বিল মেটানোর জন্য ব্যাঙ্কে টাকা তুলতে গিয়ে তিনি দেখেন কার্ডে কোনো ব্যালেন্স নেই। সেই মুহূর্তের অসহায়ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, যাদের কাছেই সাহায্যের জন্য গিয়েছেন বা টাকা চেয়েছেন, কেউ তাঁকে বিশ্বাস করেনি। এমনকি তাঁর নিজের পরিচিত জগত ও বন্ধুদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি তিনি। এই ‘জিরো ব্যালেন্স’ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটাই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ‘প্রত্যাবর্তন’।

আর্থিক সংকটের প্রভাব কতটা গভীরে ছিল, তা বোঝা যায় যখন তিনি তাঁর ছেলের স্কুলের পড়াশোনা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেন, এমন এক সময় গিয়েছে যখন ছেলের স্কুলের মাইনে দেওয়া বা ভালো স্কুলে ভর্তি করার মতো সামর্থ্য তাঁর ছিল না। শিল্পী জানান, সাধারণ মানুষের ধারণা থাকে তারকাদের জীবন হয়তো সবসময় সচ্ছল, কিন্তু বাস্তবে পড়াশোনার বিপুল খরচ মেটাতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়েছে। এমনকি লোন পাওয়ার ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। তবুও হাল না ছেড়ে তিনি লড়াই চালিয়ে গেছেন যাতে তাঁর ব্যক্তিগত অভাবের প্রভাব সন্তানের ভবিষ্যতের ওপর না পড়ে।

কেরিয়ারের মধ্যগগনেও তিনি দেখেছেন প্রবল ধস। ১৯৯৪ সালে প্রথম অ্যালবামের অভাবনীয় সাফল্যের পর ৯৫ এবং ৯৬ সালের পরপর দুটি অ্যালবাম শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। সেই সময় ইন্ডাস্ট্রি ও সাধারণ মানুষের ধারণা তৈরি হয়েছিল যে শিলাজিৎ বোধহয় ফুরিয়ে গেছেন। সেই সময় তিনি গান ছেড়ে মুম্বইতে বিজ্ঞাপনের চাকরিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এমনকি মুম্বইয়ের একটি শো-তে গিয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে তাঁর গোটা দল যখন আটকে পড়ে, তখন চূড়ান্ত আর্থিক ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক দিতে হয়েছিল তাঁকে। এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের মর্গেজ লোন নিয়ে তাঁকে সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল।

শিল্পী তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সন্তানের সাথে সম্পর্কের সমীকরণ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি জানান, তাঁর বাবার সাথে তাঁর সম্পর্কের মধ্যে একটি কঠোরতা ছিল, যা তিনি নিজের ছেলের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাননি। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন বাবা হিসেবে সন্তানদের ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। শিল্পী অকপটে স্বীকার করেন যে, একসময় রাগের মাথায় ছেলেকে আঘাত করে তিনি এতটাই অনুতপ্ত হয়েছিলেন যে তারপর থেকে সম্পর্কের সংজ্ঞাটাই বদলে ফেলেছেন। আজকের প্রজন্মের বাবা-মায়ের সাথে সন্তানদের যে ‘কমিউনিকেশন গ্যাপ’ তৈরি হয়, তা মেটাতে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোই যে একমাত্র পথ, তা তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ ‘আমার বয়স ও যোগ্যতা অনুযায়ী সঠিক চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাই না’ পিআর পারসন নন বলে কাজ কম, মানতে নারাজ অনিন্দ্য সেনগুপ্ত! সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ডের চাপেই কি এই পরিণতি? মুখ খুললেন অভিনেতা!

পরিশেষে, তাঁর নতুন সিনেমা ‘প্রত্যাবর্তন’ নিয়ে তিনি বেশ আশাবাদী। অনির্বাণ এবং অভিজিতের পরিচালনায় এই সিনেমায় তিনি এক অদ্ভুত সুন্দর চরিত্রে অভিনয় করেছেন যেখানে অভিনেতা অঞ্জন দত্তর সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে স্মরণীয়। শিলাজিতের ভাষায়, এই সিনেমাটি কেবল বিনোদন নয়, এটি প্রতিটি বাবা ও সন্তানের দেখা উচিত যাতে তারা একে অপরকে আরও ভালো করে বুঝতে পারে। জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতা ও অভাবকে জয় করে শিলাজিতের এই ফিরে আসার গল্প যেন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে শেখায়।

Back to top button