‘পকেটে ছিলনা টাকা, পরাণদা ডেকে দুপুর বেলা ভাত খাওয়াতেন…’ ‘প্রডিউসারদের দরজায় দরজায় ঘুরেছি!’ ‘উনি না থাকলে সেদিন কী হতো জানি না!’ স্মৃতিচারণে আবেগপ্রবণ শুভাশিস মুখোপাধ্যায় !

টলিউড (Tollywood) অভিনেতা শুভাশিস মুখোপাধ্যায় (Subhasish Mukhopadhyay) মানেই পর্দায় একগাল হাসি আর নিখুঁত কমেডি টাইমিং। কিন্তু এই হাসিখুশি পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্ট্রাগল পিরিয়ড এবং প্রবীণ অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক অজানা অধ্যায় ভাগ করে নিলেন তিনি। বর্তমানে স্টার জলসার ‘সংসারের সংকীর্তন’ ধারাবাহিকে তাঁদের একসাথে দেখা গেলেও, এই সম্পর্কের ভিত তৈরি হয়েছিল আজ থেকে বহু বছর আগে।

শুভাশিস মুখোপাধ্যায় জানান, কেরিয়ারের শুরুর দিনগুলো তাঁর জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। তৎকালীন সময়ে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পাওয়ার আশায় তিনি দিনের পর দিন ধর্মতলা পাড়ায় ঘুরতেন। প্রডিউসার এবং ডিস্ট্রিবিউটারদের দরজায় দরজায় কাজ ভিক্ষা করা ছিল তাঁর নিত্যদিনের রুটিন। শুভাশিস বাবু স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই সময় তাঁর আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে অনেক দিন দুপুরে সামান্য খাবার টুকু খাওয়ার মতো টাকাও তাঁর পকেটে থাকতো না। ধর্মতলার রাস্তায় কাজের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও, খিদের মুখে কী খাবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন তরুণ অভিনেতা।

সেই কঠিন সময়ে শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের কাছে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন অভিনেতা পরান বন্দ্যোপাধ্যায়। শুভাশিস জানান, ধর্মতলায় একটি মিষ্টির দোকানের পাশের গলিতে একটি পুরনো বাড়িতে তখন পরান দা সরকারি চাকরি করতেন। শুভাশিস বাবু যখনই ফোন করতেন, পরান বন্দ্যোপাধ্যায় তৎক্ষণাৎ তাঁকে তাঁর অফিসে ডেকে নিতেন। শুভাশিস বাবুর ভাষায়, “পরান দা দেখলেই জিজ্ঞাসা করতেন, ‘শরবত খাবি? চলে আয়’।” দিনের পর দিন সেই অফিসে বসে শরবত খাওয়া, খাবার খাওয়া আর পরান দা-র কাছে অভিনয়ের শিক্ষা নেওয়া এটাই ছিল তাঁর সেই দুঃসময়ের একমাত্র আশ্রয়। পরান বন্দ্যোপাধ্যায় তখন নিজের টিফিনের খাবারও শুভাশিসের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন।

বর্তমানে ‘সংসারের সংকীর্তন’ ধারাবাহিকে শুভাশিস মুখোপাধ্যায় এবং পরান বন্দ্যোপাধ্যায় যথাক্রমে জামাই এবং শ্বশুরের চরিত্রে অভিনয় করছেন। এই প্রসঙ্গে শুভাশিস বাবু বলেন, “আজ যখন একই ফ্রেমে পরান দা-র সঙ্গে কাজ করি, তখন বারবার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। আমি তাঁর কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ।” তাঁর মতে, পরান বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু একজন সহ-অভিনেতা নন, বরং একজন শিক্ষক। এমনকি আজও শুটিংয়ের ফাঁকে যখন পরান দা সচিন দেব বর্মনের গান ধরেন বা পুরনো দিনের গল্প করেন, তখন সেই পুরনো ছাত্রের মতোই মুগ্ধ হয়ে শোনেন শুভাশিস। এই কৃতজ্ঞতাবোধই তাঁদের পর্দার রসায়নকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।

কেরিয়ারের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে ধারাবাহিকের আমূল পরিবর্তন দেখেছেন তিনি। শুভাশিস জানান, আগের মতো সাহিত্যনির্ভর কাজের অভাব বর্তমানে স্পষ্ট। আগে সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে যে সময় এবং যত্ন নিয়ে কাজ হতো, এখনকার দ্রুতগামী মেগা সিরিয়ালে তা অনেকটাই ফিকে। তবুও ‘সংসারের সংকীর্তন’-এর মতো ভিন্নধর্মী গল্পে কাজ করে তিনি আনন্দ পাচ্ছেন। বিশেষ করে পরান বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘স্টলওয়ার্ট’ অভিনেতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করাটা তাঁকে আজও উত্তেজিত করে। তিনি মনে করেন, মেগা সিরিয়ালের এই যান্ত্রিকতার মধ্যেও তাঁদের এই ব্যক্তিগত বন্ডিংটাই কাজের মান বজায় রাখতে সাহায্য করছে।

আরও পড়ুনঃ ‘মুখে চোখে রং, পরনে জোকারের পোশাক, হাতে ভাঙা হৃদয়!’ জোকারের লুকে চমক রায়ান ওরফে উদয় প্রতাপের! প্রকাশ্যে ‘পরিণীতা’র বিশেষ পর্ব!

সবশেষে অভিনেতা তাঁর বর্তমান চরিত্র এবং ব্যক্তিগত জীবনের মেলবন্ধন নিয়ে কথা বলেন। উত্তর কলকাতার ঘটি বাড়ির সন্তান হিসেবে তিনি এই ধারাবাহিকের চরিত্রটিকে খুব সহজেই আত্মস্থ করতে পেরেছেন। শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের মতে, বাস্তবের সেই লড়াইয়ের দিনগুলোই তাঁকে আজ একজন পরিণত মানুষ এবং অভিনেতা হিসেবে গড়ে তুলেছে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধারাবাহিকে শ্বশুর-বৌমার যে টক্কর দর্শক দেখছেন, তার পেছনে লুকিয়ে আছে বহু বছরের অভিজ্ঞতা এবং একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর আশা, অতীতের সেই লড়াইয়ের মতো বর্তমানের এই নতুন চেষ্টাও দর্শকরা সাদরে গ্রহণ করবেন।

Back to top button