‘বাবা নেই, আমি আর মা এখন শূন্য থেকে লড়াই করছি!’ ‘মাখন লাগাতে পারিনি বলেই হয়তো অভিনেত্রী হতে পারলাম না!’ তাপস কন্যা সোহিনীর গলায় একরাশ অভিমান!

টলিউডের (Tollywood) ইতিহাসের পাতায় ‘দাদার কীর্তি’র সেই সহজ-সরল ‘কেদার’ কিংবা ‘সাহেব’ ছবির সেই আত্মত্যাগী ফুটবলারকে বাঙালি কোনোদিন ভুলতে পারবে না। ১৯৮০ সালে তরুণ মজুমদারের হাত ধরে সিনেমায় আসা তাপস পালের (Tapas Pal) শুরুটা ছিল একদম রূপকথার মতো। তাঁর মিষ্টি হাসি আর পাশের বাড়ির ছেলের মতো ইমেজ দর্শকদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, প্রথম ছবিতেই তিনি সুপারস্টার হয়ে যান। এরপর একে একে ‘গুরুদক্ষিণা’, ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’র মতো অজস্র হিট ছবি তিনি উপহার দিয়েছেন। বিশেষ করে ‘সাহেব’ ছবিতে একজন ফুটবলারের চরিত্রে তাঁর অভিনয় আজও মানুষের চোখে জল এনে দেয়। নব্বইয়ের দশকে যখন বাংলা সিনেমা ধুঁকছিল, তখনও তিনি বাণিজ্যিক ছবির হাল ধরে রেখেছিলেন একার কাঁধে।

তাপস পালের অভিনয় জীবন যতটা উজ্জ্বল ছিল, রাজনৈতিক কেরিয়ারে পা রাখার পর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ততটাই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একদিকে যেমন ‘সাহেব’, ‘অনুরাগের ছোঁয়া’র মতো কালজয়ী সিনেমা উপহার দিয়েছেন, অন্যদিকে রাজনীতির ময়দানে তাঁর কিছু মন্তব্য তাঁকে জনমানসে খলনায়কের আসনেও বসিয়েছিল। অভিনয়ের মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় যে মানুষটি দিনে তিন-চারটি শিফটে কাজ করতেন, শেষ জীবনে তাঁর একাকিত্ব এবং শারীরিক অবনতি অনেক অপ্রিয় সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। পর্দার হিরো আর বাস্তবের রাজনীতিক এই দুই সত্তার লড়াইয়ে বারবার রক্তাক্ত হয়েছে তাঁর ভাবমূর্তি, যা আজও টলিপাড়ার অন্দরে বিতর্কের অন্যতম খোরাক।

সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তাপস-কন্যা সোহিনী পাল তাঁর বাবার এক অন্য রূপ তুলে ধরেছেন। সোহিনী জানিয়েছেন, তাপস পাল যখন খ্যাতির শিখরে, তখন তিনি একজন অভিনেতা নন বরং একজন দায়িত্বশীল পিতা হিসেবেই ঘরে ফিরতেন। সুপারস্টার হওয়ার কোনো দম্ভ তাঁর মধ্যে ছিল না। এমনকি শুটিংয়ের ব্যস্ততার মাঝেও সোহিনীর স্কুলের ‘স্পোর্টস ডে’ বা ‘প্যারেন্ট-টিচার মিটিং’-এ পৌঁছে যেতেন তিনি। এমনকি মাঝে মাঝে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন স্কুলে। এই তথ্যটি পাঠকদের মনে প্রশ্ন জাগাতে বাধ্য যে মানুষটি পর্দার বাইরে এতই সাধারণ ছিলেন, রাজনীতির কূটকচালি কি তবে তাঁকে বাধ্য করেছিল ভুল পথে চালিত হতে?

সোহিনীর কথায় উঠে এসেছে এক মর্মান্তিক সত্য। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর বা পরবর্তীকালে যখন তিনি মুম্বইয়ে থাকতেন, বাবার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অবিচ্ছিন্ন। লোকসভার অধিবেশন হোক বা বিদেশের কোনো শুট, তিনবারের বেশি রিং হওয়ার আগেই ফোন তুলতেন তাপস পাল। বাবার চলে যাওয়ার পর মা ও মেয়েকে যে কঠিন জীবনসংগ্রামের মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা সোহিনীর কথায় স্পষ্ট। ‘বাবা চলে যাওয়ার পরে আমাকে আর মাকে নতুন করে জীবন শুরু করতে হলো’ এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় যে ইন্ডাস্ট্রির তথাকথিত ‘দাদা’র পরিবারের জন্য পর্দার পেছনের লড়াইটা কতটা যন্ত্রণাদায়ক ছিল।

আরও পড়ুনঃ বাপের বাড়ির শেষ সম্বলটুকুও পল্লবীর জন্য বিসর্জন! গয়না বেচে পল্লবীর বিয়ের টাকা জোগাড়ের সিদ্ধান্ত নিল কমলা! দুর্ধর্ষ আজকের পর্ব

অভিনয় জগত নিয়ে সোহিনীর অভিজ্ঞতাও বেশ নাটকীয়। মুম্বইয়ে গিয়ে অডিশন দেওয়া থেকে শুরু করে ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির বুকিং হেড হিসেবে কাজ করা পর্দার সামনের চেয়ে পেছনের কাজই তাকে বেশি টেনেছে। তবে তাঁর মন্তব্যে হালকা অভিমানও ঝরে পড়েছে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে তিনি হয়তো ঠিকঠাক ‘মাখন লাগাতে’ বা দ্রুত বন্ধুত্ব করতে পারেন না বলেই তথাকথিত ‘সফল’ অভিনেত্রী হতে পারেননি। আজ যখন তিনি পজিটিভ থাকার চেষ্টা করছেন, তখন প্রশ্ন ওঠে টলিউড কি কেবল তোষামোদকারীদেরই জায়গা? নাকি তাপস পালের কন্যার যোগ্য সম্মান পাওয়া এখনও বাকি? এই বিতর্কিত প্রশ্নটিই আজ ভক্তদের মনে ঘোরাফেরা করছে।

Back to top button